মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী:(Powers and functions of the Chief Minister).

ভারতবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছে ও সেইসাথে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি স্বীকৃত হয়েছে। তাই এখানে দু - প্রকার সরকারের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে ও কেন্দ্রের সংসদীয় গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যটি রাজ্যের শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। অন্যভাবে বলা যায় যে, কেন্দ্রীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক মডেলটি রাজ্যের শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও স্বীকৃত ও গৃহীত হয়েছে, আর সেই কারণেই কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায়। একজন প্রকৃত শাসক অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির পাশাপাশি একজন নিয়মতান্ত্রিক শাসকপ্রধানের অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি ঘটেছে। একইভাবে রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় প্রকৃত শাসক হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতির পাশাপাশি একজন নিয়মতান্ত্রিক শাসক হিসাবে রাজ্যপালের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। তবে কেন্দ্রের শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যেরূপ ক্ষমতা ভােগ করে থাকেন রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় কোনাে মুখ্যমন্ত্রী সেরূপ ক্ষমতা ভােগ করতে পারেন না। এর প্রধান কারণ হল কেন্দ্রের নিয়মতান্ত্রিক শাসক হিসাবে রাষ্ট্রপতির কোনাে স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা নেই ও সংবিধানের ৪২ তম সংশােধন অনুসারে রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীসভার পরামর্শ মতাে কাজ করতে বাধ্য থাকেন। কিন্তু রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকৃত শাসক হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপাল তার স্বেচ্ছাধীন বিশেষ ক্ষমতা প্রয়ােগ। করে মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীপরিষদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন ও মুখ্যমন্ত্রীর সাহায্য ও পরামর্শ ছাড়াই কার্য সম্পাদন করতে পারেন। এরূপ ক্ষেত্রে প্রকৃত শাসক হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও পদমর্যাদা ক্ষুন্ন হয়ে থাকে। 

ভারতীয় সংবিধানে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে কিছু বলা হয়নি। এ বিষয়ে সঠিক ধারণা লাভের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সাথে রাজ্যপাল, মন্ত্রীসভা, বিধানসভা ও তার দলের সাথে তার সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়গুলি আলােচনা করা দরকার। মুখ্যমন্ত্রীর পদমর্যাদা ও ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে উক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের সাথে তার সম্পর্কের উপর। 



যাই হােক, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নিম্নলিখিত বিষয়গুলির উপর নির্ভর করে তার ক্ষমতা ও পদমর্যাদার চিত্রটি লাভ করা যেতে পারে:

রাজ্যপালের মুখ্য পরামর্শদাতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী:👉

অঙ্গরাজ্যের শাসনকার্যে রাজ্যপালকে সাহায্য ও পরামর্শদানের জন্য একটি মন্ত্রীসভা থাকে। এই মন্ত্রীসভার নেতা হলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই সুবাদে তিনি হলেন রাজ্যপালের প্রধান পরামর্শদাতা। মুখ্যমন্ত্রীর মাধ্যমেই রাজ্যপালের সাথে মন্ত্রীসভার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব হল শাসনকার্য ও আইনের বিভিন্ন প্রস্তাব মন্ত্রীসভার যাবতীয় সিদ্ধান্ত রাজ্যপালকে জানানাে। তবে রাজ্যপালের সাথে মুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্ক বহুলাংশে নির্ভর করে উভয়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক বােঝাপড়া ও সহযােগিতার মনােভাবের উপর।

মন্ত্রীসভার নেতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী:👉

মন্ত্রীসভায় মুখ্যমন্ত্রীর স্থান সম্পর্কে প্রথাগতভাবে বলা যায় যে, মুখ্যমন্ত্রী হলেন ‘সমপর্যায়ভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অগ্রগণ্য’(First among equals)। কিন্তু বর্তমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র অগ্রগণ্যই নন; মন্ত্রীসভার সকল মন্ত্রীদের থেকে তার ক্ষমতা ও পদমর্যাদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে ও মুখ্যমন্ত্রী প্রকৃতপক্ষে রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় একজন একনায়কতান্ত্রিক শাসকে পরিণত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম অথবা তামিলনাড় প্রভৃতি রাজ্যগুলিতে বিগত কয়েক দশক ধরে কোনাে নির্দিষ্ট ব্যক্তি এককভাবে রাজ্যের শাসনবিষয়ক যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। অনেক ক্ষেত্রে, মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত বলতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত হিসাবেই তা জনগণের কাছে গণ্য হয়েছে। 

বিধানসভার নেতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী:👉

মুখ্যমন্ত্রী হলেন নিজ রাজ্যের বিধানসভার নেতা কারণ বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবেই নির্বাচিত হওয়ায় তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। রাজ্যের আইনসভার কার্যতালিকা তার নিয়ন্ত্রণাধীন। তিনি রাজ্যপালের মাধ্যমে রাজ্য আইনসভার অধিবেশন আহ্বান করার বা স্থগিত রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভা ভেঙ্গে দেবার জন্য রাজ্যপালকে পরামর্শ দিতে পারেন। বিধানসভায় নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার ব্যাপারে তাকে সবসময়ই সতর্ক থাকতে হয়। বিরােধী দলগুলির সাথে যােগাযােগ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারেও মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্যোগী হতে হয় অর্থাৎ, আইনসভায় বিরােধী দলের সাথে সরকারী দলের বােঝাপড়া ও সহযােগী সম্পর্ক যাতে গড়ে ওঠে সে বিষয়ে তিনি নজর রাখেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী:👉

সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতাসীন হন। তাই দলের উপর তার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। দলের ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে ভারতের অনেক রাজ্যেই কোনাে দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে সমর্থ না হওয়ায় সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দলের নেতা হিসাবে সেই ব্যক্তি মুখ্যমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন। সেক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীকে যুগ্ম কোয়ালিশন সরকারের প্রধান হিসাবে যে দায়িত্বটি পালন করতে হয়, তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে সমন্বয় ও ভারসাম্য রক্ষা করে ও বিভিন্ন দলের দাবীগুলির প্রতি সুবিচার করে কোয়ালিশন সরকারের মুখ্যমন্ত্রীকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রেই জোটবদ্ধ সরকারের পরিস্থিতিকে বিচার করে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে তার সহযােগী দলগুলির সাথে বােঝাপড়ায় আসতে হয়।


        মুখ্যমন্ত্রীর উপরিউক্ত ক্ষমতা ও কার্যাবলীর উপর নির্ভর করেই তার পদমর্যাদার চিত্রটি অঙ্কন করা যেতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ও তার ভাবমূর্তি নির্ভর করে শুধুমাত্র সংবিধানসম্মত ক্ষমতাভােগের মধ্য দিয়ে নয়, তার ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার উপর একজন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদমর্যাদাটি নির্ণীত হয়ে থাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী:(Powers and functions of the Chief Minister)."