ভারতের জোট নিরপেক্ষ নীতির উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য: (Objectives and characteristics of non-aligned policy)
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত তার চির আকাঙ্খিত সেই স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকেই ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতির সূচনা হয়। বর্ণ বৈষম্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভারতের বক্তব্য বিশ্বের আঙিনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
যার রূপকার হলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। তিনি যে পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করেন তা 'জোট নিরপেক্ষ নীতি' নামে পরিচিত।জোট নিরপেক্ষ নীতি :–
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীতে আবিভূত হয়েছিল দুইটি শত্র ভাবাপন্ন শিবির একদিকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে সোভিয়েত রাশিয়া।
জওহরলাল নেহরু বুঝেছিলেন এশিয়া ও আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলির স্বার্থ কোনভাবেই উপরিউক্ত দুই শিবিরের স্বার্থের সঙ্গে রাখা যাবে না।
তাই তিনি উক্ত গোষ্ঠীদুটির কোনোদিকেই যোগ না দিয়েই সমদূরত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। এই জন্য এই নীতিকে বলা হয় জোটনিরপেক্ষ নীতি।
জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণের কারণ বা উদ্দেশ্যে :–
ভৌগোলিক অবস্থান : ভারত এশিয়া মহদেশের দক্ষিণ কেন্দ্রে অবস্থিত। পাকিস্তান ও চীনের মত দুটি শত্র“ রাষ্ট্রের উপস্থিতি একটি বড় চিন্তার কারণ।
জাতীয় ঐতিহ্য : প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষ অহিংসা, শান্তি ও সহনশীলতার পূজারী। গৌতমবুদ্ধ, অশোক, আকবর, শিবাজি প্রমুখের বাণী আঞ্চলিকতাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
রাজনৈতিক মতবাদ : ভারত পুঁজিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ কোনোটিকেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করেননি।
এছাড়াও ন্যাৎসিবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদের জওহরলাল নেহেরু তীব্র নিন্দা করেছেন।
অর্থনৈতিক কারণ : দেশভাগ, বেকারত্ব এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদির কারণে স্বাধীন ভারতের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ে। ভারত তাই চেয়েছিল আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ের কাছ থেকে সাহায্য নিতে।
জোট নিরপেক্ষ নীতির বৈশিষ্ট্য :
ভারতের জোট নিরপেক্ষ নীতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলো হল-
নিরপেক্ষতা : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে বিশ্বের দুই প্রধান শক্তিশালী গোষ্ঠী আমেরিকা ও রাশিয়ার ধনতান্ত্রিক ও সাম্রাজ্যতান্ত্রিক রাষ্ট্র জোটের বাইরে থেকে ভারত নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করে চলে।
শান্তিনীতি : ভারতের জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি সম্পূর্ণরূপে শান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোরিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য সবস্থানে ভারত শান্তির পধ ধরে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট।
বর্ণবৈষম্য বিরোধী : ভারত বর্ণবৈষম্য ও জাতিগত বিদ্বেষের বিরোধী। তাই দ: আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারত প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
নিরস্ত্রীকরন : ভারত যুদ্ধ, পররাষ্ট্রগ্রাস, পারমানবিকবোমা অস্ত্র নির্মান ইত্যাদির বিরোধিতা করে। এককথায় ভারতের উদ্দেশ্য হল তৃতীয় বিশ্বে যেন শান্তির বাতাবরন বজায় থাকে।
জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের বিকাশ :-
জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে তৃতীয় বিশ্বের জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন দ্রুত প্রসার লাভ করে। যাহাতে সাহায্যকারী ব্যক্তিরা হলেন মিশরের নাসের, ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ ইত্যাদি।
পঞ্চশীল নীতি : ১৯৫৪ সালে চীনের প্রধানমন্ত্রী ভারতে এসে উভয়ের সঙ্গে এক চুক্তিতে আবদ্ধ হন, যা পঞ্চশীল নামে পরিচিত।
পঞ্চশীল নীতির মূলকথা হল :-
- সকলের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার বজায় রাখা।
- শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
- অনাক্রমন।
- পারস্পরিক সাহায্য।
- কোন দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা।
পরিশেষে বলা যায় ভারতের জোটনিরপেক্ষতা আন্দোলন বহু আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধান করেছে। কখনোও নিরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করেনি। এই আন্দোলন বিশ্বে সোভিয়েত ও মার্কিন জঙ্গি আগ্রাসনকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল তাতে সন্দেহ নাই। যা এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
জওহরলাল নেহরুর মতে- 'যেখানে স্বাধীনতা বিপন্ন, ন্যায় নীতি আক্রান্ত, সেখানে নিরপত্তা অর্থহীন'।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "ভারতের জোট নিরপেক্ষ নীতির উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য: (Objectives and characteristics of non-aligned policy)"