মেঘ কি? মেঘের শ্রেণীবিভাগ: (What is cloud? Classification of clouds).

ঘনীভবনের অন্যতম একটি রূপ হল মেঘ। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে যত উপরে ওঠা যায় তাপমাত্রা তত কমতে থাকে। ভূ-পৃষ্ঠের সাগর, নদীনালা, খাল-বিল, পুকুর থেকে সূর্যের তাপে জলীয় বাষ্প তৈরী হয়। উত্তপ্ত জলীয় বাষ্প হাল্কা বলে উপরে ওঠে। ক্রমশ যত উপরে উঠে ততই শীতল হয় এবং একটি স্তরে গিয়ে জলীয় বাষ্প ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জল কণার আকারে পরিণত হয়ে বায়ুতে উর্ধ্বাকাশে ভেসে বেড়ায়। এসব জল কণার সমষ্টিকেই মেঘ বলে।

মেঘ কি? মেঘের শ্রেণীবিভাগ:



মেঘের প্রকারভেদ:
১৮০৩ সালে ব্রিটিশ আবহবিদ লুক হোয়ার্ড প্রথম মেঘের শ্রেণীবিভাগ করেন। বর্তমানে মেঘ কে তাদের উচ্চতার উপর ভিত্তি করে তিনটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। যেমন - 

নিচু উচ্চতার মেঘ :-  ২ কিলোমিটারের কম উচ্চতা যুক্ত মেঘ কে নিচু স্তরের মেঘ বলে। এই ধরনের মেঘ কে স্ট্র্যাটো মেঘ বল বলা হয়। 

মাঝারি  উচ্চতার মেঘ :- ২ কিমি থেকে ৬ কিমি উচ্চতা বিশিষ্ট মেঘ গুলি কে মাঝারি উচ্চতার মেঘ বলা হয়। এই স্তরের মেঘ গুলি অল্টো মেঘ বলে। 

উঁচু উচ্চতার মেঘ :- ৬০০০ মিটারের অধিক উচ্চতায় যে ধরণের মেঘের উপস্থিতি দেখা যায়, সেগুলি উঁচু স্তরের মেঘ নামে পরিচিত। এই স্তরের মেঘ গুলি সিরো নামে পরিচিত। 

আবার আকৃতির উপর ভিত্তি করে মেঘ গুলি তিন ভাগে ভাগ করা হয় - 
         ● সিরাস মেঘ
         ● স্ট্র্যাটাস মেঘ
         ● কিউমুলাস মেঘ। 



সিরাস মেঘ :- সিরাস শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ থেকে যার অর্থ হল চুলের কুচি। এই ধরণের মেঘ গুলি সাধারনত ৬ থেকে ১০ কিমি উচ্চতায় দেখা যায়। এই ধরণের মেঘে জলকনার পরিবর্তে বরফকনার উপস্থিতি থাকে। এই ধরনের মেঘ গুলি সাদা এবং পাখির পালকের মতো সারা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে।  নীল রৌদ্রজ্বল পরিষ্কার আকাশে সিরাস মেঘ গুলি এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করে।



স্ট্র্যাটাস মেঘ :- স্ট্র্যাটাস একটি ল্যাটিন শব্দ যার অর্থ স্তর। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৬ কিমি উচ্চতা পর্যন্ত এই মেঘের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। কোন কোন সময় ধূসর স্ট্র্যাটাস মেঘ আকাশ কে ঢেকে ফেলে।



কিউমুলাস মেঘ :- ল্যাটিন শব্দ কিউমুলাস  এর অর্থ হল স্তূপ। এই ধরনের মেঘের সিরাস ও স্ট্র্যাটাস মেঘের মতো অনুভূমিক স্তর গঠনের পরিবর্তে  উল্লম্ব গঠন যুক্ত হয়ে থাকে। গোলাকার বা ফুলকপির মতো বিশাল মেঘের স্তূপের আকারে এই মেঘ উপস্থিত হয়ে থাকে। কিউমুলাস মেঘ অস্থির ও দুর্যোগপূর্ন আবহাওয়াকে নির্দেশ করে। এই ধরণের মেঘ অনেকটা পেঁজা তুলোর মতো দেখতে হয়। 



মেঘ কীভাবে সৃষ্টি হয়?
মেঘ সৃষ্টির প্রধান শর্ত হল বায়ুমণ্ডলীয় স্থিরতা ও বায়ুর ঊর্ধ্বগমন। প্রথম অবস্থায় পৃথিবীর জলভাগ থেকে সৌরতাপ জনিত কারণে যে জলীয় বাষ্প তৈরি হয় বায়ুর সঙ্গে মিশে যায়। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমান বাড়লে বাতাস হালকা হয়ে যায় এবং তা  ক্রমশ ওপরে উঠতে থাকে। এই জলীয় বাষ্প পূর্ন বাতাস একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় উত্থিত হলে বায়ুর উষ্ণতা শিশির বিন্দুতে এসে পৌছালে তা জলকনা আবার কখনো কখনো বরফ বা তুষার কনায় পরিনত হয়। কিন্তু এই জলকনা গুলি একাই বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকতে পারে না তার জন্য প্রয়োজন হয় অতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পদার্থের, যাদের অ্যারোসল বলা হয়ে থাকে। অ্যারোসল জাতীয় পদার্থের মধ্যে অন্যতম হল সূক্ষ্ম ধূলকনা, লবন কনা। এই অ্যারোসল জাতীয় পদার্থ কে বেষ্ঠন করে জলকনা গুলো অবস্থান করলে ঘন কালো মেঘের সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ এটা বলা যায় মেঘ সৃষ্টিতে এরোসলের গুরুত্ব অনেক। এরোসল না থাকলে আকাশে মেঘের সৃষ্টি হত না আর মেঘ সৃষ্টি না হলে বৃষ্টিও হতো না । 



মেঘের শ্রেণীবিভাগ: 
WMO এর অন্তর্গত International Clouds Atlas মেঘ কে উচ্চতা, আকৃতি ও গঠনের ওপর ভিত্তি করে ১০ টি প্রধান ভাগে ভাগ করে। এই ১০ প্রকারের মেঘ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হল। 


উঁচু স্তরের মেঘ:

সিরাস মেঘ :- অধিক উচ্চতায় স্বচ্ছ সাদা রঙের পাখির পালক বা চুলের মতো মেঘ গুলিকে সিরাস মেঘ বলা হয়। এই মেঘে সূক্ষ্ম বরফ কুচির অবস্থান থাকে এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত্রের সময় মেঘ গুলি দেখতে চমৎকার রকমের সুন্দর লাগে। এই মেঘ থেকে বৃষ্টিপাত হয় না। 


সিরো-কিউমুলাস মেঘ :- পাতলা সাদা রঙের মেঘ যা আকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করে থোকা থোকা ভাবে অবস্থান করে। এই ধরণের মেঘ খুব কম পরিমানে আকাশে দেখা যায়। সিরো কিউমুলাস মেঘ আকাশে ম্যাকারেল মাছের কাঁটার মতো সারি বদ্ধ ভাবে ছড়িয়ে থাকে বলে, একে ম্যাকারেল মেঘ বলা হয়। 


সিরো-স্ট্র্যাটাস মেঘ :-  এটি এক ধরণের স্বচ্ছ মেঘ যা সূর্য ও চাঁদের চারিদিকে হোলো বা বর্নবলয় সৃষ্টি করে। 



মধ্যবর্তী স্তরের মেঘ:

অল্টো কিউমুলাস মেঘ :- সাদা ও ধূসর রঙের এই মেঘ  হোলো বা আলোক প্রভার সৃষ্টি করে না।  অল্টো কিউমুলাস মেঘের গোলাকার গুচ্ছ কে পশম মেঘ বলা হয়। এই মেঘ গুলি আকাশে তরঙ্গের আকারে বা সমান্তরাল সারির মতো অবস্থান করে। 


অল্টো স্ট্র্যাটাস মেঘ :- ধূসর বা নীলচে রঙের স্তূরীভূত এই মেঘ চাদরের মতো বিস্তৃত থাকে। আকাশের এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে এই মেঘ ছড়িয়ে থাকে। এই ধরণের মেঘ থেকে এক নাগাড়ে অনেক সময় ধরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি বা তুষার পাত হয়ে থাকে। 



নিম্ন স্তরীয় মেঘ:

নিম্বো স্ট্র্যাটাস মেঘ :- ধূসর বা কালো রঙের মেঘ । নিম্ন স্তরের এই নিম্বো স্ট্র্যাটাস মেঘ প্রচুর বৃষ্টিপাত বা তুষারপাত হয়ে থাকে। কিন্তু এই ধরণের মেঘ থেকে কখনো বিদ্যুৎ, বর্জ্রপাত ও শিলা বৃষ্টি হয় না। নিম্বো স্ট্যাটাস মেঘকে rain cloud বলা হয়।


স্ট্র্যাটো কিউমুলাস মেঘ :- ২.৫ কিমি থেকে ৩ কিমি উচ্চতায় যে সাদা রঙের মেঘ দেখা যায়। এই ধরণের মেঘের উপস্থিতি পরিষ্কার আবহাওয়াকে নির্দেশ করে কিন্তু মাঝে মধ্যে এই ধরণের মেঘ থেকে বৃষ্টি বা তুষারপাত হয়ে থাকে। 


স্ট্র্যাটাস মেঘ :- ঘন কুয়াশার মতো এই মেঘ গভীর ধূসর রঙের মেঘ, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে খুব স্বল্প উচ্চতায় অবস্থান করে। 


কিউমুলাস মেঘ :- টাওয়ার বা চূড়ার মতো উল্লম্ব বিস্তৃত ঘন মেঘ কে কিউমুলাস মেঘ বলে। এই মেঘ গুলির ওপরের অংশ ফুলকপির মতো বিস্তৃত হয়। এই মেঘে পরিচলন স্রোতের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই মেঘ স্থলভাগের ওপর দিনের বেলা দেখা যায়। 


কিউমুলোনিম্বাস :- পাহাড় বা বড়ো টাওয়ারের মতো উল্লম্ব বিস্তৃত এই ঘন কালো জলীয় বাষ্প পূর্ন এই মেঘ থেকে ক্রান্তীয় অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এই মেঘের ফলে বৃষ্টিপাতের সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড বর্জ্রপাত, বিদ্যুৎ চমক ও শিলা বৃষ্টি হয়ে থাকে।  এই কিউমুলোনিম্বাস মেঘ কে thunder cloud বলা হয়ে থাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "মেঘ কি? মেঘের শ্রেণীবিভাগ: (What is cloud? Classification of clouds)."