লালন ফকির: (Lalon Fakir).

উনিশ শতকে বাংলায় সর্বধর্মসমন্বয়ের ক্ষেত্রে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন আধ্যাত্মিক বাউলসাধক লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০ খ্রিঃ) বা লালন সাঁই।


● লালন ফকিরের প্রথম জীবন:
লালনের প্রথম জীবনের বেশকিছু বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবত তিনি ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে যশোহর জেলায় ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে বা কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি থানার ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তরুণ বয়সে তীর্থভ্রমণে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে মলম শাহ ও তাঁর স্ত্রী মতিজানের সেবায় তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

● লালন ফকিরের ধর্মবিশ্বাস:
লালন হিন্দু না মুসলিম ছিলেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ তাঁকে হিন্দু, আবার কেউ বা মুসলিম বলে মনে করতেন। কিন্তু লালন নিজে এবিষয়ে কিছু না বলে বরং গান বেঁধেছেন—

“সব লোকে কয় লালন কি জাতি সংসারে।
লালন বলে জাতের কি রুপ
দেখলাম না এই নজরে।

অন্য একটি গানে লালন লিখেছেন—
এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।
যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান
জাতি গোত্র নাহি রবে।

● লালন ফকিরের বাউল গান:
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা না থাকলেও লালন নিজ সাধনাবলে হিন্দু ও মুসলিম ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন এবং মানবজীবনের আধ্যাত্মিক রহস্য নিয়ে প্রায় দু-হাজার বাউল গান রচনা করেন।

● লালন ফকিরের ‘মনের মানুষ’ -এর ধারণা:
লালন বিশ্বাস করতেন, সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। সেই মনের মানুষের কোনো জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গভেদ নেই। তাই সেই মানুষকে নিয়ে লালন গান বাঁধেন—
“মিলন হবে কত দিনে , আমার মনের মানুষেরই সনে।”

● লালন ফকিরের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ:
ঠাকুর পরিবারের অনেকের সঙ্গে লালনের যোগাযোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালনের গান ও দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেন — আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।”

● লালন ফকিরের মৃত্যু:
লালন সকল ধর্মের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতেন। তিনি হিন্দু ও ইসলাম — উভয় ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ১১৬ বছর বয়সে লালনের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর হিন্দু বা মুসলিম কোনো ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করা হয়নি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "লালন ফকির: (Lalon Fakir)."