ওজোন কি? ওজোন গহ্বর সৃষ্টির কারণ ও ফলাফল: (Ozone Hole).

ওজোন হল হালকা নীলাভ আঁশটে গন্ধযুক্ত এক বিশেষ প্রকারের গ্যাস। একটি ওজোন অণুর মধ্যে তিনটি অক্সিজেন পরমাণু বর্তমান। এর সংকেত O3। তরল ওজোনের স্ফুটনাঙ্ক ১১২.৪°C এবং কঠিন ওজোনের গলনাঙ্ক -২৪৯.৭°C।



বায়ুমণ্ডলে ওজোন কিভাবে সৃষ্টি হয়?
বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন (O2) সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে অক্সিজেন পরমাণুতে (O) ভেঙে যায় এবং অক্সিজেন পরমাণুর সঙ্গে অক্সিজেন অণুর (O2) রাসায়নিক সংযোগে ওজোন উৎপন্ন হয়।

বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর:
ভূপৃষ্ঠের ওপরে ১০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার অঞ্চল পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর বিস্তৃত। এই স্তরটি একটি ফাঁপা গোলকের মতো পৃথিবীকে আবৃত করে রেখেছে। মানুষ সহ সমগ্র জীবজগৎ -এর ওপর এই স্তরের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। এই স্তরে ওজোনের ঘনত্ব সাধারণ অক্সিজেনের প্রায় এক লক্ষ গুণ বেশি। এই উচ্চতার ওপরে এবং নীচে ওজোন অবশ্য বিভিন্ন মাত্রায় রয়েছে। বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অঞ্চলে ওজোন সবসময়েই উৎপন্ন হচ্ছে, আবার ধ্বংসও হচ্ছে। এই সৃষ্টি ও ধ্বংসের মধ্যে মোটামুটি একটি সাম্য অবস্থা বিরাজ করছে। এখন এই সাম্য অবস্থায় থাকা ওজোনের পরিমাণ যদি হঠাৎ কমে যায়, তবে UV রশ্মি বা অতিবেগুনি রশ্মি বেশি পরিমাণে ভূপৃষ্ঠে আপতিত হবে এবং ক্ষতিকর প্রভাব বৃদ্ধি পাবে।

ওজোন গহ্বর কি?
ওজোন গহ্বর বা ওজোন হোল হল বায়ুমণ্ডলের ১০ থেকে ৪০ কিলোমিটার উচ্চতায় স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের মধ্যে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মিকে শোষণ ও প্রতিহত করার জন্য ওজোন গ্যাসের যে প্রাকৃতিক আবরণ আছে, তার ক্ষয় বা পুরুভাব নষ্ট হয়ে যাওয়া। বিজ্ঞানী ফারমেন ওজোন স্তরের অবক্ষয়কে 'ওজোন হোল' নামে চিহ্নিত করেন। ১৯৮২ সালে অক্টোবরের দিকে অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে সমীক্ষারত একদল ব্রিটিশ বিজ্ঞানী লক্ষ করেন ঊর্ধ্বাকাশে একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে ওজোনের পরিমাণ অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। পরবর্তী বছরগুলিতে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে তাঁরা দেখতে পান এই ওজোনের ঘাটতির পরিমাণ ক্রমশ ব্যাপকতর হয়ে গহ্বরের মতো হয়েছে। একেই বলা হয় 'ওজোন গহ্বর' বা 'ওজোন হোল'। পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ২০-৩০ কিলোমিটার উচ্চতায় স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরে অবস্থিত ওজোন স্তরের ওজোন অণু ক্ষয় হওয়ার ফলে যে গহ্বর সৃষ্টি হয় তাকে ওজোন হোল বলে।

ওজোন গহ্বর সৃষ্টির কারণ:
রেফ্রিজারেটারে, ওষুধ তৈরিতে, পলিমার শিল্পে (গদি, বালিশ প্রস্তুতিতে) প্রভৃতি বিভিন্ন শিল্পে প্রচুর পরিমাণে CFC ব্যবহৃত হয়। এই সমস্ত CFC উদ্বায়ী, বাতাসে নির্গমনের পথ করে দিলে এগুলি ট্রোপোস্ফিয়ারের ওপর দিক থেকে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্ট্যাটোস্ফিয়ারের ওজোনকে ধ্বংস করে এবং অপসারিত করে। এই গ্যাস মানুষের সৃষ্ট (CFC হল কার্বন, ক্লোরিন এবং ফ্লুওরিনঘটিত যৌগসমূহ)
যৌগগুলি হল-
(i) ট্রাইক্লোরোফ্লুওরো মিথেন।
(ii) ডাইক্লোরোফ্লুওরো মিথেন।
(iii) ট্রাইক্লোরোফ্লুওরো মিথেন।
(iv) CF4

দ্রুতগামী উড়োজাহাজ যখন স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে, তখন প্রচুর পরিমাণে NO এবং NO, (নাইট্রোজেনের অক্সাইড) নির্গত হয় — এগুলিও ওজোন স্তরের পক্ষে ক্ষতিকারক। শুধু ধোলাই ও পরিষ্কার করার তরল হিসেবে ব্যবহৃত কার্বন টেট্রাক্লোরাইডও ওজোন স্তর ক্ষয়ে অংশ নেয়। ইথাইল ক্লোরোফর্ম — যা দ্রাবক পরিষ্কার করার তরল হিসেবে ব্যবহৃত হয় – তা ওজোন স্তর বিনাশের জন্য দায়ী।

ওজোন স্তর অবক্ষয়ের ফলাফল:
জলবায়ুর উপর প্রভাব: রশ্মি অধিকতর মাত্রায় পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছোলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলস্বরূপ মেরু অঞ্চলের বরফ গলবে এবং সমুদ্রের জলতলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া ওজোনের পরিমাণ হ্রাস পেলে ট্রোপোস্ফিয়ারে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড -এর পরিমাণ বাড়বে এবং এর ফলে অম্লবৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া ওজোন স্তর ক্ষয়ের ফলে ভূপৃষ্ঠে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব বাড়বে এবং আলোক রাসায়নিক বিক্রিয়া বৃদ্ধি পেয়ে ‘ধোঁয়াশা’ সৃষ্টির প্রবণতাও বৃদ্ধি পাবে।

উদ্ভিদজগতের ওপর প্রভাব: অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে নদী, হ্রদ, জলাশয়ের মাছ ও জুপ্ল্যাংকটন ধ্বংস হওয়ার ফলে জলাশয়ের বাস্তুরীতি বিঘ্নিত হবে। ফলে উদ্ভিদজগৎও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সালোকসংশ্লেষ ব্যাহত হবে। অঙ্কুরোদ্গমও ব্যাহত হবে। অধিক তাপের ফলে গাছের পাতা, ফল শুকিয়ে যাবে। গাছের বৃদ্ধি কমে যাবে।

প্রাণীজগতের ওপর প্রভাব: অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে জুপ্ল্যাংকটনের মৃত্যু হার বাড়বে। জীবাণু ধ্বংস হবে। জীবজন্তুর প্রজনন ক্ষমতা ও রোগ - প্রতিরোধ ক্ষমতা কমরে। ধীরে ধীরে প্রাণীজগৎ -এর নিজস্ব ভারসাম্য নষ্ট হবে।

মানুষের ওপর প্রভাব: ওজোন হোল সৃষ্টি হলে অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি ভূপৃষ্ঠে আপতিত হবে, ফলে একদিকে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা যেমন বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে মানুষের ত্বকের ক্যানসার রোগও বাড়বে। দেহের রোগ - প্রতিরোধ ক্ষমতা কমবে। চোখে অসময়ে ছানি পড়বে। ধোঁয়াশা বৃদ্ধির কারণে মানুষের শ্বাসকষ্ট বাড়বে এবং প্রজনন ক্ষমতাও হ্রাস পাবে।

ওজোন গহ্বর বা ওজোন হোল নিয়ন্ত্রণের উপায়:
☞ সারা পৃথিবী জুড়েই বর্তমানে ওজোন হ্রাসকারী বস্তুসমূহের Ozone depleting substances (ODS) ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বা বন্ধ করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে।

সর্বোপরি ওজোন স্তরের ক্ষয় বা ওজোন গহ্বর এবং এর কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা প্রয়োজন।

প্লাস্টিক শিল্প, রেফ্রিজারেটার উৎপাদন শিল্প, রঞ্জক শিল্প প্রভৃতি ক্ষেত্রে পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বলবৎ করা দরকার। রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাবিত ‘অ্যাজেন্ডা-২১’ কর্মসূচি মেনে চলা প্রয়োজন।

বিভিন্ন শিল্পে যাদের ওজোন গহ্বর সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে তাদের ক্ষেত্রে দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্রপাতি বসানো প্রয়োজন।

ক্লোরোফ্লুওরো কার্বনের উৎপাদন ও ব্যবহার আইন করে বন্ধ করা প্রয়োজন। এর পরিবর্তে অন্য কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা জরুরি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "ওজোন কি? ওজোন গহ্বর সৃষ্টির কারণ ও ফলাফল: (Ozone Hole)."