হিমালয় পর্বত সৃষ্টির কারণ: (The reason for the creation of the Himalayas).
ভারতের উত্তরে অবস্থিত হিমালয় পর্বত হল প্রকৃতপক্ষে এক নবীন ভঙ্গিল পর্বত। এই পর্বতের উৎপত্তি বা সৃষ্টির কারণকে প্রধানত দুইভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন—
(ক) মহীখাত বা জিওসিনক্লাইন তত্ত্ব।(খ) পাতগাঠনিক বা প্লেট টেকটনিক তত্ত্ব।
(ক) মহীখাত বা জিওসিনক্লাইন তত্ত্ব:
মহীখাত তত্ত্বের প্রবক্তা হলেন বিজ্ঞানী কোবার। এই তত্ত্ব অনুসারে বর্তমান যে অঞ্চলটিতে হিমালয় পর্বতমালা অবস্থান করছে, সেখানে আজ থেকে প্রায় বারো কোটি বছর আগে টার্সিয়ারি যুগে টেথিস সাগর নামে এক বিস্তীর্ণ অগভীর জলাভূমি ছিল, যার অর্থ মহীখাত। কালক্রমে মহীখাতটির উত্তর (আঙ্গারল্যান্ড) ও দক্ষিণ (গণ্ডোয়ানাল্যান্ড) পার্শ্বস্থ প্রাচীন মালভূমি দুটি থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত পলিরাশি নদনদী বাহিত হয়ে মহীখাতটিকে প্রায় ভরাট করে ফেলেছিল। যেহেতু, টেথিস মহীখাতটি ছিল ভূত্বকের একটি দুর্বল স্থান, সেহেতু এই পলিরাশি একসময় ভূ-স্তরে নিম্নমুখী চাপের সৃষ্টি করে। এই চাপের ফলে টেথিস মহীখাতের তলদেশ ক্রমশ বসে যেতে থাকে, এর ফলে প্রবল ভূ-আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, ফলে গন্ডোয়ানাল্যান্ডের তলদেশের ভারতীয় পাত এবং আঙ্গারল্যান্ডের তলদেশের এশিয়া পাত গতিশীল হয়ে পড়ে।
ভারতীয় পাতের গতিবেগ অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় তা এশিয়া পাতের দক্ষিণ দিকে প্রবল আঘাত করে, যার ফলে মালভূমি দুটি পরস্পরের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়। সংঘটিত পার্শ্বচাপে টেথিস সমুদ্রের সঞ্চিত পলিতে ভাঁজ পড়তে থাকে। পরবর্তীকালে এইসব ভাঁজগুলি দৃঢ় সংঘবদ্ধ ও উঁচু হয়ে বর্তমান হিমালয়ের রূপ পরিগ্রহ করেছে। হিমালয়ের শিলাস্তরে যে-সমস্ত জলজ জীবাশ্ম পাওয়া গেছে তাদের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়েছে।
(খ) পাতগাঠনিক বা প্লেট টেকটনিক তত্ত্ব:
পর্বতের গঠন সম্পর্কিত সর্বাধুনিক তত্ত্ব হল এই পাতগাঠনিক তত্ত্ব। উইলসন, মর্গান, পিচৌ প্রভৃতি ব্যক্তিগণ হলেন এই ধারনার প্রবক্তা। এই তত্ত্ব অনুসারে বলা হয় যে, ভু-ত্বক সাতটি বড়ো, কুড়িটি মাঝারি ও অসংখ্য ছোটো পাত দ্বারা গঠিত। এই পাতগুলি তরল অ্যাথেনেস্ফিয়ারের ওপর গতিশীল অবস্থায় ভাসছে। এই তত্ত্বে বলা হয় যে, বর্তমানে যেখানে হিমালয় পর্বত অবস্থিত সেই স্থানটি ভারতের উপদ্বীপীয় ও ইউরেশিয়া নামক দুটি মহাদেশীয় পাতের সংযোগস্থল।
পরস্পরের দিকে অগ্রসরগামী এই পাত দুটির মধ্যে ভারতীয় পাত বেশি গতিশীল ও ভারী হওয়ায়, ধীরগামী ও হালকা ইউরোপীয় পাতের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং ভারতীয় পাতটি ভূগর্ভে প্রবেশ করে। এর ফলে এই দুই পাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত পলিসঞ্চিত টেথিস মহীখাতের পলিরাশিতে প্রবল চাপ পড়ে। ফলে ভাঁজের সৃষ্টি হয়ে হিমালয় পর্বতের উত্থান হয়। আজ থেকে প্রায় বারো কোটি বছর আগে টার্সিয়ারি যুগে হিমালয় পর্বতের উত্থান পর্ব শুরু হলেও পর পর তিনটি ভূ-আন্দোলনের মাধ্যমে হিমালয়ের উত্থান পর্ব সম্পূর্ণ হয় এবং বহু যুগ ধরে তা চলে।
প্রথম ভূ-আন্দোলনের (বারো থেকে সাত কোটি বছর আগে) টেথিস ও হিমাদ্রি হিমালয়, দ্বিতীয় ভূ-আন্দোলনের (আড়াই থেকে তিন কোটি বছর আগে) ফলে হিমাচল বা মধ্য হিমালয় এবং তৃতীয় বা সর্বশেষ ভূ-আন্দোলনের ফলে (যা আজ থেকে কুড়ি লক্ষ বছর আগে) বহিঃহিমালয় বা শিবালিক পর্বতমালার সৃষ্টি হয়।
তবে বলা হয় যে, হিমালয়ের গঠন প্রক্রিয়া এখনো সমাপ্ত হয়নি। যেহেতু, ভারতীয় পাতটি এখনো প্রতিবছর প্রায় ৫.৪ সেমি করে উত্তরদিকে এগিয়ে চলেছে, সেহেতু, হিমালয়ের পাতগাঠনিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকায় হিমালয়ের উত্থান এখনো ঘটে চলেছে। ১৯৯৩ সালে মহারাষ্ট্রের লাটুরে ভয়ংকর ভূমিকম্প আন্তঃপাত (Intra plate) সঞ্চালনের ফলে ঘটে। প্রায় ২০,০০০ মানুষ মরা যান।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "হিমালয় পর্বত সৃষ্টির কারণ: (The reason for the creation of the Himalayas)."