প্লেইস্টোসিন যুগের বৈশিষ্ট্য: (Characteristics of the Pleistocene era).

সেনোজোয়িক পর্বের শেষদিকে প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে যে ভূতাত্ত্বিক যুগের সূচনা হয় এবং যে যুগে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ বরফে ঢাকা পড়ে, সেই যুগ প্লেইস্টোসিন যুগ (Pleistocene Age) বা বরফ যুগ নামে পরিচিত।
১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্লেইস্টোসিন কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন স্যার চার্লস লিয়াল। ‘প্লেইস্টোসিন’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'Pleistos' থেকে, যার অর্থ অধিকাংশ নতুন। প্লেইস্টোসিন যুগের সূত্রপাত ঘটেছিল আজ থেকে অন্তত ২০ লক্ষ বছর পূর্বে এবং শেষ হয় আজ থেকে প্রায় ১১ হাজার বছর পূর্বে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, যে যুগে বিভিন্ন পর্যায়ের মানব বিবর্তনের একাধিক জীবাশ্ম পাওয়া গেছে এবং যে যুগের শেষে হোমো স্যাপিয়েন্স অর্থাৎ আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে।


প্লেইস্টোসিন যুগের বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নে আলোচনা করছি:


তুষার যুগ: 
প্লেইস্টোসিন যুগের দীর্ঘ সময় জুড়ে তীব্র শীতের অস্তিত্ব ছিল। পৃথিবীর উপরিভাগ ক্রমশ শীতল হয়ে এই সময় পৃথিবীতে তুষার যুগের আবির্ভাব ঘটে। প্রায় সমগ্র উত্তর গোলার্ধ বরফের চাদরে ঢাকা পড়ে যায়।

ভূগঠনের পরিবর্তন: 
প্লেইস্টোসিন যুগে পৃথিবীর গঠনগত যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন মহাদেশীয় ভূখণ্ডগুলি ধীরে ধীরে সরতে সরতে তা দীর্ঘকাল পর এখনকার অবস্থায় পৌঁছায়। এই সময় মাটির বর্তমান গঠন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় এবং সমুদ্রে জলস্তরের উচ্চতা কমে যায়।

আবহাওয়ার পরিবর্তন: 
প্লেইস্টোসিন যুগে বারবার আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে। এই যুগের মধ্যেই পৃথিবীতে পর্যায়ক্রমে কয়েকটি উষ্ণ ও শীতল যুগের আবির্ভাব হয়। ড. আলব্রেখট পেঙ্ক ও ড. ব্রুকনার তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, এইসময়
[ i] গুনজ্।
[ii] মিন্‌ডেল।
[iii] রিস্।
[iv] ঊরম্।
— এই চারটি তুষার যুগের উদ্ভব হয়েছিল এবং প্রতিটি যুগ গড়ে ১ লক্ষ ২৫ বছর স্থায়ী হয়েছিল। প্রতিটি তুষার যুগের মাঝখানে একটি করে উস্ন যুগের অস্তিত্ব ছিল।

প্রজাতির বিলুপ্তি: 
প্লেইস্টোসিন যুগে বারবার আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে বেশ কিছু প্রজাতির প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াতে ব্যর্থ হয়। এই প্রতিকূল পরিবেশে ম্যামথ, বেশ কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী, বিশালাকার পাখি প্রভৃতির বিলুপ্তি ঘটে।

পরিযান: 
এ যুগের অধিকাংশ সময় তুষার যুগ বিরাজ করায় সমুদ্রের জল বরফে পরিণত হয় এবং ভূভাগের বেশির ভাগ স্থান বরফে ঢেকে যায়। এভাবে স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে সংযোগ গড়ে উঠলে স্থলভাগের পশু ও মানুষের পক্ষে বরফের সমুদ্র অতিক্রম করে পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া সম্ভব হয়।

আধুনিক মানুষের আবির্ভাব: 
প্লেইস্টোসিন যুগের শেষ দিকে হোমো স্যাপিয়েন্স অর্থাৎ আধুনিক মানুষের আবির্ভাব ঘটে। চিন্তাশক্তি ও বিচক্ষণতার জন্য পশুর সঙ্গে মানুষের বিরাট পার্থক্য গড়ে দেয়।

উপসংহার: 
প্লেইস্টোসিন যুগ হল একটি ভূতাত্ত্বিক পর্ব। এযুগে বারবার আবহাওয়া ও অন্যান্য ভূগাঠনিক পরিবর্তন মানুষকে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে শিখিয়ে দেয়। এর ফলে মানুষ পরিবেশের সঙ্গে একাত্ম হয়ে পরবর্তীকালে উন্নততর সভ্যতা গড়ে তোলে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "প্লেইস্টোসিন যুগের বৈশিষ্ট্য: (Characteristics of the Pleistocene era)."