ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন: (Machiavelli's political philosophy).


ম্যাকিয়াভেলির জীবন:

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি, পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তাধারার অন্যতম বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব, ১৪৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫২৭ সালে মারা যান। ২৯ বছর বয়সে তিনি তার নিজ রাজ্য ফ্লোরেন্সের জনসেবায় নাম নথিভুক্ত করেন। তাঁর সেবা মাত্র চৌদ্দ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্রের শীর্ষ নীতি-নির্ধারকদের একজন ছিলেন।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং এটি তাকে নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের নীতি প্রয়োগের অভ্যন্তরীণ বৃত্তের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম করেছিল।

তিনি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের এত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন যে তাকে প্রায়শই ফ্রান্স এবং জার্মানিতে কূটনৈতিক মিশনে পাঠানো হত। কিন্তু দুর্ভাগ্য বলে তিনি গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হন এবং এর জন্য তাকে শাস্তি ভোগ করতে হয়। ১৫১২ সালে তিনি তার চাকরি হারান। কিন্তু চাকরি থেকে তার অপসারণ তার কাছে ছদ্মবেশে আশীর্বাদ বলে মনে হয়েছিল।


এই বাধ্যতামূলক অবসরকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছেন গঠনমূলক কাজে। বাধ্যতামূলক অবসর সময়ে তিনি তার বিখ্যাত বই 'দ্য প্রিন্স' লিখেছিলেন যা ১৫১৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি প্রবলভাবে আশা করেছিলেন যে তিনি তার আগের চাকরি ফিরে পাবেন কিন্তু তার আশা অপূর্ণ থেকে যায়।

স্বাভাবিকভাবেই ম্যাকিয়াভেলি একজন বেকার ব্যক্তি থেকে গেছেন বা, আমরা বলতে পারি, বাধ্যতামূলক অবসরে। কিন্তু তিনি তা একাডেমিক কাজে ব্যবহার করেছেন। তিনি আরেকটি বই 'The Discourses' প্রকাশ করেন। দ্য প্রিন্সকে অনেকে উপদেশ বই হিসাবে দেখেন কারণ এতে একজন রাজপুত্রকে তার কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয় সে সম্পর্কে অনেক উপদেশ রয়েছে।

করণীয় এবং করণীয় হল দ্য প্রিন্সের কেন্দ্রীয় ধারণা। কিন্তু ডিসকোর্স হল রাষ্ট্র বা দেহের রাজনীতিকে ব্যবচ্ছেদ ও বিশ্লেষণ করার প্রয়াস। এটি সমসাময়িক রাজনীতির দার্শনিক এবং ঐতিহাসিক দিকগুলিও আলোচনা করে।

ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন:
'দ্য প্রিন্স' বইটিতে ম্যাকিয়াভেলি লিখেছেন, শাসনক্ষমতার বৈধতা কোনো নৈতিকতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ নয়; কর্তৃত্ব আর ক্ষমতাই এখানে মূল বিষয়। যার ক্ষমতা আছে সে-ই শাসন করবে, নৈতিকতা কাউকে ক্ষমতায় বসায় না। ক্ষমতা অর্জন আর ক্ষমতা রক্ষা করাই রাজনীতির মূলনীতি। ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহার দিয়েই জনগণের আনুগত্য অর্জন করতে হয়। রাজনীতি মানেই হলো ক্ষমতা ‘গ্রহণ আর প্রয়োগের’।

নীতিকথাটি শুনতে যতই কঠিন আর রূঢ় শোনাক না কেন, বাস্তবতা এটাকেই সমর্থন করে আসছে। বইটিতে তিনি একটি দেশের উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘ শাসনের ওপর জোর দেন। এতে শাসক তার শাসনক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী কিভাবে কাজ করবে তার বর্ণনা রয়েছে। পাশাপাশি, তিনি প্রশাসন ও প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সৈন্যদের বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যবহারের কৌশলগুলোর ওপর বিস্তারিত বর্ণনা করেন। বইটিকে আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রথম লেখা হিসেবে কৃতিত্ব দেয়া হয়ে থাকে। কেননা, এতে মূর্ত ধারণার পরিবর্তে কার্যকরি সত্য গ্রহণ করা হয়েছে।

'দ্য প্রিন্স’ ও ‘ডিসকোর্সের' ধারণা:
ম্যাকিয়াভেলি ‘দ্য প্রিন্স’ ও ‘ডিসকোর্সের’ মধ্যে যে রাষ্ট্রদর্শন প্রচার করেছেন তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো মানব প্রকৃতি ও মনোভাব সম্পর্কে তার ধারণা। ম্যাকিয়াভেলির মতানুসারে, মানুষ প্রকৃতিগতভাবে খারাপ। তার মধ্যে ভালো বা সদগুণ বলে সহজাত কোনো জিনিস নেই। তিনি মানুষকে ‘দুর্বলতা, ভ্রম ও শঠতা’র এমন একটি যোগফল বলে বিবেচনা করেন, যে চতুর লোকের হাতে পড়ে বোকায় পরিণত হয় এবং যাকে স্বেচ্ছাচারী শাসক তার স্বেচ্ছাচারিতার শিকারে পরিণত করে’। সাধারণভাবে মানুষকে তিনি ‘অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, প্রতারক, কাপুরুষ ও লোভী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য হলো- তার থেকে সবল কোনো শক্তির দ্বারা বাধ্য না হলে সে ভালো কিছু করতে চায় না। স্বার্থপরতা ও কলহপ্রিয়তা মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সুতরাং সে সুযোগ পেলেই অন্যায় কর্মে লিপ্ত হতে চায়। তা ছাড়া মানুষ চায়, সব থেকে ভালো জিনিসটি তার হোক এবং তার ভাগেই সবচেয়ে বেশি পড়ুক। মোট কথা, মানুষের লোভ-লালসার সীমা নেই। সে চায় গোটা বিশ্বকেই গ্রাস করতে। মানুষের এই সহজাত স্বার্থপরতা ও লোভ-লালসার কারণে তাদের মধ্যে অবিরাম দ্বন্দ্ব-কলহ লেগেই থাকে এবং আইনের সবল হস্তে ব্যাহত না হওয়া পর্যন্ত তারা সমাজজীবনকে নৈরাজ্যিক অবস্থায় পরিণত করতে চায়।

ম্যাকিয়াভেলি বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্রই হচ্ছে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং সেদিক দিয়ে তা অন্য কোনো উচ্চতার ক্ষমতার অধীন হতে পারে না। মধ্যযুগে সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হতো যে, পার্থিব ও ক্ষমতা হিসেবে রাষ্ট্রধর্ম, নৈতিকতা, ঐশ্বরিক আইন বা প্রাকৃতিক আইনের উচ্চতর ক্ষমতার অধীন। কিন্তু ম্যাকিয়াভেলি এসব ক্ষমতাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঘোষণা করেন, এগুলো সব বাজে কথা, রাষ্ট্রই হচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং তার ওপর কোনো উচ্চতর ক্ষমতা থাকতে পারে না। ম্যাকিয়াভেলি আরো বিশ্বাস করেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব, নিরাপত্তা ও সম্প্রসারণের জন্য যা কিছু অনুকূল, তাই করতে পারে। এতে ধর্ম বা নৈতিকতা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। তার মতে, রাষ্ট্রকে সবসময় যে ধর্ম ও নৈতিকতার পথ ধরে চলতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। ম্যাকিয়াভেলি অবশ্য মনে করেন, ধর্ম ও নৈতিকতার পথ অনুসরণ করে রাষ্ট্র যদি তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে তবে তা হবে সর্বাপেক্ষা উত্তম। কিন্তু যেহেতু মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ, প্রতারক, লোভী ও হিংসুটে, কাজেই এ পথে চলে রাষ্ট্র কোনো দিনই তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে না। প্রতি পদক্ষেপে তাকে বাধাপ্রাপ্ত হতে হবে। সুতরাং ধর্ম বা নৈতিকতার কথা আদৌ চিন্তা না করে রাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য ‘যা কিছু অনুকূলে’ তাই করে যাবে। তার মতে, রাষ্ট্র যদি চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারে, মাধ্যম যতই নিচ বা ঘৃণ্য হোক না কেন অর্জিত সাফল্যই মাধ্যমের যৌক্তিকতা প্রমাণ করবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, লক্ষ্য মাধ্যমের যৌক্তিকতা বিধান করে, মাধ্যম লক্ষ্যের নয়।

ম্যাকিয়াভেলি যেখানে সম্ভব, সেখানে প্রজাতান্ত্রিক শাসন এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে রাজতান্ত্রিক শাসনের কথা বলেছেন। অভিজাততন্ত্র ও অমাত্য ব্যক্তিদের শাসন সম্পর্কে তার অত্যন্ত হীন ধারণা ছিল। তার মতে, সম্ভ্রান্ত অভিজাতদের স্বার্থ রাজা বা জনসাধারণ কারো স্বার্থের অনুকূল নয়। এরা রাষ্ট্রের শান্তি ও স্থায়িত্বের ঘোর দুশমন, কাজেই সুশৃঙ্খল শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এদেরকে সমূলে বিনাশ করা প্রয়োজন। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা হলো- ‘এসব ভদ্দর লোকেরা তাদের সম্পদ থেকে আহরিত লভ্যাংশের ওপর আলস্যপূর্ণ জীবনযাপন করে, কিন্তু সমাজের আদৌ কোনো উপকার করে না। তারা সর্বত্র সরকারি শাসনের দুশমনিতে লিপ্ত থাকে।’

রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ম্যাকিয়াভেলি যে স্থায়ী আসন লাভ করেছেন তার একটি বড় কারণ হলো- তিনি জাতীয় রাষ্ট্রের প্রথম প্রবক্তা। প্রাচীন যুগ যেমন ছিল নগররাষ্ট্রের যুগ এবং মধ্যযুগ বিশ্বজনীন সাম্রাজ্যের যুগ, তেমনি বর্তমান যুগ হলো জাতীয় রাষ্ট্রের যুগ। সুতরাং জাতীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের জনক হিসেবে আমরা ম্যাকিয়াভেলিকে একজন যুগস্রষ্টা চিন্তাবিদ বলেও আখ্যায়িত করতে পারি। আমরা বলতে পারি, ম্যাকিয়াভেলিকে শুধু ‘ম্যাকিয়াভেলিবাদদের’ জন্মদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা অনুচিত। তার চিন্তাধারার মধ্যে যে আরো বহু গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়নি। এ কথা অনস্বীকার্য, ষোড়শ শতাব্দীতে যদি ম্যাকিয়াভেলির আবির্ভাব না হতো, তাহলে হয়তো আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার জন্ম আরো দীর্ঘ দিন বিলম্বিত হয়ে যেত। রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ম্যাকিয়াভেলির মূল্য নির্ধারণ করতে গিয়ে ডব্লিউ টি জোনস বলেন, ‘রাষ্ট্রকে শুধু যে মানুষের লোভ ও ক্ষুধার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যায়, ম্যাকিয়াভেলির এই অন্তর্দৃষ্টি এবং লোভ ও ক্ষুধার এই শক্তি কী করে দমন করতে হয় একজন সফল শাসকের তা অবশ্যই জানা প্রয়োজন, ম্যাকিয়াভেলির এই পরবর্তী স্বীকৃতি, রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা করে এবং তা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সার্বিক বিকাশের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষের স্বাভাবিক হীন চরিত্রকে ‘সামষ্টিক ভালো’তে পরিণত করার সবচেয়ে ভালো হাতিয়ার হচ্ছে রাষ্ট্র। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি সামরিক সক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সফল সরকারের অবশ্যই একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী প্রয়োজন। দেশের প্রতিটি নাগরিককে অপর নাগরিকের হাত থেকে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর। তার মতে, সে রাষ্ট্রই সফল যার নাগরিকরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে, তাদের প্রতি কোনো অন্যায় হতে পারে না কিংবা হলেও তারা তার সঠিক বিচার পাবে।

অনেকের মতে, সারা ইউরোপের এই উন্নয়ন পুরোটাই ম্যাকিয়াভেলির তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত। আর সে কারণে ইউরোপিয়ানরা রাস্তাঘাটে আইন মেনে চলে, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ এড়িয়ে চলে, কেউ বেশি গরিবও নয়, আবার কেউ মাত্রাতিরিক্ত ধনীও নয়। অফিস আদালতে কোনো ঘুষবাণিজ্য নেই, টেন্ডারবাণিজ্য নেই, মন্ত্রিপরিষদে কেউ দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হয় না। মানুষের দাবি আদায়ের জন্য হরতাল-ধর্মঘট করতে হয় না। নাগরিকের মৌলিক সমস্যার সমাধান রাষ্ট্রই করে থাকে। শিক্ষা, চিকিৎসা নিতে এসে মানুষ প্রতারিত হয় না। রাষ্ট্র যদি নাগরিককে কাজ দিতে না পারে তাহলে রাষ্ট্র তাকে বেকার ভাতা দেয়।  তাহলে সাধারণ মানুষ একদিন অ্যারিস্টটলের গণতন্ত্রের কথা ভুলে গিয়ে সুনাগরিক হয়ে যাবে; রাষ্ট্রের সেবক হয়ে যাবে। ম্যাকিয়াভেলির মতে, ‘সামষ্টিক ভালোর জন্য কোনো কাজ করতে গেলে নৈতিক-অনৈতিক বিবেচনার কোনো প্রয়োজন নেই’। এটা বর্তমান সরকার সুনিপুণভাবে করেই যাচ্ছে। অবশ্য ম্যাকিয়াভেলি যা-ই বলেছেন তার মূল লক্ষ্য ছিল একটি আদর্শ শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন।

মধ্যযুগে প্রাকৃতিক অপেক্ষা অপ্রাকৃতিক ধারণাগুলো মানুষের চিন্তাকে অধিক প্রভাবিত করত। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশ লাভ করার ফলে অতিপ্রাকৃতিক ধারণাগুলোর পরিবর্তন হয় এবং মানুষকে তার বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রতিফলিত দেখতে পাওয়া যায়। এভাবে রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, স্বাধীনতাসহ সবকিছু সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষ ঘটে এবং সমগ্র ইউরোপে নতুন এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই পরিবেশ ম্যাকিয়াভেলির চিন্তাধারাকেও স্পর্শ করে এবং তার রাষ্ট্রচিন্তার সর্বত্র এর সুস্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হয়। প্রধানত এসব কারণে ম্যাকিয়াভেলিকে আধুনিক জাতীয় রাষ্ট্রের জনক বলে অভিহিত করা হয়।

ম্যাকিয়াভেলি এবং রেনেসাঁ:
পশ্চিমা রাজনৈতিক চিন্তাধারার অনেক সমালোচক ম্যাকিয়াভেলিকে রেনেসাঁর সন্তান বলে ডাকতে পছন্দ করেন। ডব্লিউটি জোনস বলেন, 'ম্যাকিয়াভেলি ছিলেন ফ্লোরেন্স এবং রেনেসাঁর সন্তান। সমস্ত গুণাবলী যা তার শহর এবং তার বয়সের বৈশিষ্ট্য তার নিজের ব্যক্তিত্বের মধ্যে উপস্থিত হয়'।

রেনেসাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এর প্রভাবে এসে মানুষ সবকিছুকে, বিশেষ করে রাজনীতিকে নতুন আলোকে বিচার ও মূল্য দিতে শুরু করে। এমনকি তারা নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, ধর্মের মতো মূল্যবোধও স্ক্যান করেছে।

মধ্যযুগে মানুষ গির্জা, পোপ এবং সর্বোপরি ধর্ম দ্বারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়েছিল। তার স্বাধীন চিন্তাশক্তি ছিল না। কিন্তু রেনেসাঁর আবির্ভাব এই অবস্থার পরিবর্তন করে এবং মানুষ তার নিজস্ব যুক্তি প্রয়োগ করে ধর্ম, মূল্যবোধ ইত্যাদি চিন্তা করতে শুরু করে।

ম্যাকিয়াভেলিও তা গ্রহণ করেছিলেন। চিরাচরিত পথ ভেঙেছেন তিনি। তিনি নতুন চিন্তা, যুক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন। তাই সাধারণ মানুষ এবং ম্যাকিয়াভেলি উভয়েই তাদের চিন্তাধারা এবং মূল্যবোধের পদ্ধতি পরিবর্তন করেছিলেন।

তিনি মনে করতেন যে মানুষকে কেবল গির্জার পরামর্শ মেনে চলার জন্য এবং কিছু ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি।

তিনি আরও লক্ষ্য করেছেন যে গোঁড়া ধর্ম তার চিন্তা করার ক্ষমতা এবং যুক্তি অনুসরণ বা মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে যথেষ্ট কমিয়ে দিয়েছে। এটি ইতালীয় সমাজে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ইউরোপের সর্বত্র রেনেসাঁ একটি নতুন চিন্তাভাবনা এবং শিক্ষার অগ্রগতি তৈরি করেছিল। রেনেসাঁ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল আরও জানতে এবং এগিয়ে যেতে। কিন্তু ইতালির মানুষ অন্ধকারেই রয়ে গেল।

ম্যাকিয়াভেলি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে ইতালির জনগণকে এই অবস্থান থেকে রক্ষা করতে হবে এবং তাদের "রক্তে" নতুন চিন্তা প্রবেশ করাতে হবে। রেনেসাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি এই লাইনে চিন্তা করেছিলেন।

ইতিহাসের অধ্যয়ন তার মনে একটি নতুন ধারণা জাগিয়েছিল এবং তা হল ঈশ্বর এবং গির্জার প্রতি সেবা এবং আনুগত্য কখনই সামাজিক উন্নতির কারণ হতে পারে না। এই উদ্দেশ্যে মানুষকে সমাজ ও মানুষের সেবা করতে হবে। ধর্ম, নীতি ও নৈতিকতার প্রভাব দূর করে মানুষকে বাস্তবমুখী করতে হবে।

তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে জনসাধারণের ক্ষেত্রে ধর্ম, নৈতিকতা এবং নীতির কোনও মর্যাদা থাকতে হবে না। কেবলমাত্র একজন শক্তিশালী রাজপুত্র যার হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রয়েছে তা অর্জন করতে পারে। ডব্লিউটি জোনস লিখেছেন, রেনেসাঁর একটি পণ্য, যেমন ম্যাকিয়াভেলি একটি উদ্দেশ্যমূলক নৈতিক আদেশের পুরানো মধ্যযুগীয় জাতিকে প্রত্যাখ্যান করে, যা ঈশ্বর দ্বারা নির্ধারিত, এবং যার প্রেসক্রিপশন অনুসারে পুরুষরা সেরা জীবনযাপন করে।
বিপরীতে, তার জন্য সেই জীবনই সর্বোত্তম যা একজন মানুষকে খ্যাতি, স্বাতন্ত্র্য, সম্মান এবং খ্যাতি এনে দেয় বলা বাহুল্য যে ম্যাকিয়াভেলি তার বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রেনেসাঁ থেকে পেয়েছিলেন। রেনেসাঁ মানুষকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছিল যে মানুষ যদি আরও ভাল জীবনযাপন এবং ভাল পরিস্থিতি চায় তবে তাকে অবশ্যই বস্তুগত পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে - ঈশ্বর বা ধর্ম বা নৈতিকতার দিকে নয়। এগুলো সবই বিষয়ভিত্তিক এবং মানুষকে সামগ্রিক উন্নতি লাভে সাহায্য করতে পারে না।

রেনেসাঁর আগে মানুষ পোপের হাতের পুতুল ছিল এবং এর ফলে যুক্তি ও যৌক্তিকতা হারিয়েছিল। কিন্তু তাকে অবশ্যই ভাবতে হবে যে সে যুক্তি, যুক্তি এবং বিচারের শক্তিতে সমৃদ্ধ। এই সমস্ত গুণাবলী প্রয়োগ করে সে তার বস্তুগত অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি করতে পারে।

ঈশ্বরের আনুগত্য, নৈতিকতা, ধর্ম মানুষের বৈষয়িক অবস্থার পরিবর্তন ও উন্নতির কোনো ক্ষমতা রাখে না। রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ের লোকেরা এই ধারণাটি অর্জন করেছিল এবং ম্যাকিয়াভেলি ইতালীয় সমাজের সাধারণ উন্নতির জন্য এটি প্রয়োগ করা বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেছিলেন। এটি বস্তুবাদ, এবং আমরা এটিকে ম্যাকিয়াভেলিজমও বলি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন: (Machiavelli's political philosophy)."