সবুজ বিপ্লব | ভারতের সবুজ বিপ্লবের সুফল ও কুফল: Green Revolution | The pros and cons of the Green Revolution in India:
- প্রথাগত বা প্রাচীন কৃষি পদ্ধতির পরিবর্তে উন্নতমানের বীজ, রাসায়নিক সার, উন্নত কৃষি প্রযুক্তির সাহায্যে কৃষিজ ফসল উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। একে সবুজ বিপ্লব(Green Revolution) বলে।
- মেক্সিকোয় গম উন্নয়ন কর্মসূচির কর্ণধর ডক্টর নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগ(Norman Ernest Borlaug)১৯৫১ সালে নতুন প্রজাতির গম বীজ উদ্ভাবন করে সবুজ বিপ্লবের সূচনা করেন। ১৯৫০ এর দশকে মেক্সিকোয় সবুজ বিপ্লব হয়।
- ডক্টর নরম্যান আর্নেস্ট বোরলগ(Norman Ernest Borlaug)কে সবুজ বিপ্লবের জনক বলা হয়। তিনি ১৯৭০ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।
- মার্কিন প্রশাসনের তৎকালীন এক আধিকারিক William S Gaud ৮ মার্চ ১৯৬৪ সালে এক বক্তৃতায় "Green Revolution"শব্দটি প্রথম উচ্চারণ করেন।
👉ভারতের সবুজ বিপ্লব:
- ভারতের সবুজ বিপ্লবের উচ্চ ফলনশীল বীজ প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯৬৪-৬৫ সালে। সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় ১৯৬৭-৬৮ খ্রিস্টাব্দে যা পূর্বের বছরের তুলনায় ২৫% বেশি।
- মেক্সিকো থেকে উন্নত মানের গম বীজ আমদানি করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে গম চাষ করা হয়।
- ডক্টর এম এস স্বামীনাথন (M.S. Swaminathan) কে ভারতের সবুজ বিপ্লবের জনক বলা হয়। তিনি আলু, গম, চালের জীনতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন। মেক্সিকোয় বামন প্রজাতির গম এর ওপর তিনি সফল সংকরায়ন ঘটান।
👉সবুজ বিপ্লবের উপাদান:
ভারতের সবুজ বিপ্লবের ১২ টি প্রধান উপাদান রয়েছে। এগুলি হল-
i) উচ্চ ফলনশীল বীজ।
ii) জলসেচ।
iii) রাসায়নিক সার।
iv) কীটনাশক।
v) প্রকল্প এলাকার উন্নয়ন।
vi) জোতের সংহতি সাধন।
vii) ভূমি সংস্কার।
viii) কৃষি ঋণ।
ix) গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন।
x) গ্রামীণ সড়ক এবং বাজারের উন্নতি সাধন।
xi) কৃষি যন্ত্রপাতি।
xii) কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
👉উদ্দেশ্য:
i) খাদ্যে ভারতকে স্বনির্ভর করে তোলা এবং খাদ্যশস্য বিদেশে রপ্তানি করা।
ii) বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি বন্ধ করা।
👉সবুজ বিপ্লবের সুফল:
১. শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি:
সবুজ বিপ্লবের ফলে ভারতে গম ও ধানের উৎপাদন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৬৯ সালে ধানের মোট উৎপাদন ছিল ৩৫ মিলিয়ন টন। ২০১২-১৩ সালে এই পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১০৫.২৪ মিলিয়ন টন। কিন্তু জোয়ার, ডাল প্রভৃতি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়নি।
২. হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি:
উচ্চ ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রভৃতি প্রয়োগের ফলে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭০-৭১ সালে খাদ্যশস্যের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৮৭২ কেজি। ২০০৯-১০ সালে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় হেক্টরপ্রতি ১৭৯৮ কেজি।
৩. খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বনির্ভরতা:
সবুজ বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে ভারত খাদ্যশস্য উৎপাদনে অনেকটাই স্বনির্ভর হয়। ১৯৭১ সালে PL-৪৮০ পরিকল্পনা অনুসারে আমেরিকা-যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারত খাদ্যশস্য আমদানি করা বন্ধ করেছিল।
৪. কর্মসংস্থান:
কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও ফলন যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি সারা বছর জমিতে ফসল উৎপাদনের ফলে কৃষিতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
৫. কৃষকের আয় বৃদ্ধি:
সবুজ বিপ্লবের ফলে বিক্রয় যোগ্য উদ্বৃত্ত ফসলের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬. কৃষি ও শিল্পের মধ্যে যোগসূত্র:
সবুজ বিপ্লবের ফলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে যোগসূত্র মজবুত হয়। যেমন- শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে কৃষিপণ্য ব্যবহৃত হয়। কৃষিভিত্তিক শিল্পের অগ্রগতি ঘটে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এর মাধ্যমে ট্রাক্টর, পামসেট প্রকৃতির উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।
৭. কৃষকের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন:
আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকের পরিবারের শিক্ষার প্রসার ঘটে। শিক্ষিত কৃষক নতুন কৃষি প্রযুক্তি আয়ত্ত করে কৃষিক্ষেত্রে তার প্রয়োগ করতে সমর্থ হয়।
👉সবুজ বিপ্লবের কুফল:
১. কৃষকের আয়ের অসমানতা:
সবুজ বিপ্লবের ফলে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকদের আয় যতটা বৃদ্ধি পেয়েছে ভারতের অন্য অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে আয় সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি।
২. ক্ষুদ্র ও ভাগচাষীদের স্বার্থহানি:
জোতের সংহতি সাধন ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এর সুবিধার জন্য ক্ষুদ্র ও ভাগচাষীদের কাছ থেকে অল্প মূল্যে অথবা জোরপূর্বক কৃষি জমি নিয়ে নেওয়া হয়েছে।
৩. কৃষিজ ফসলের উপর গুরুত্ব প্রদান:
সবুজ বিপ্লবে গম বা ধানের উপর যেমন গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে অন্যান্য ফসলের ওপর তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। একারণে অনেকে এই বিপ্লবকে গম বিপ্লব(Wheat Revolution) বলে চিহ্নিত করেছেন।
৪. ভৌমজল স্তরের অবনমন:
শুষ্ক ঋতুতে এবং শুষ্ক এলাকায় কূপ এর মাধ্যমে জলসেচ করায় ভৌম জলের স্তর হ্রাস পেয়েছে।
৫. মৃত্তিকা দূষণ এবং জল দূষণ:
জমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক দ্রব্য ব্যবহার করার ফলে জল দূষণ ও মৃত্তিকা দূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
৬. ভূমিক্ষয়:
বারবার জমি কর্ষণ করা, বনভূমি ধ্বংস করা প্রভৃতি কাজের প্রভাবে মরু প্রায় ও স্বল্প বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পেয়েছে।
৭. ফসল উৎপাদন হ্রাস:
প্রাথমিক অবস্থায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিন সার প্রয়োগের ফলে জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে ফলে ফসল উৎপাদন ও জমির গুনমান হ্রাস পেয়েছে।
৮. স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যা:
রাসায়নিক সার ও অতিরিক্ত কীটনাশক দেওয়ার ফলে দুধ ও সবজিতে সিসা, দস্তা ও তামার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।এই সকল পদার্থ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টি করেছে।
উপরিউক্ত অসুবিধাগুলির জন্য অনেকেই সবুজ বিপ্লবকে 'ধূসর বিপ্লব’ আখ্যা দিয়ে থাকেন। তবে একথা কখনােই অস্বীকার করা যাবে না যে, সবুজ বিপ্লবের কারণেই ভারত খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে এবং বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "সবুজ বিপ্লব | ভারতের সবুজ বিপ্লবের সুফল ও কুফল: Green Revolution | The pros and cons of the Green Revolution in India:"