ভারতের জলসেচ ব্যবস্থা:(Irrigation system of India).
•জলসেচ কাকে বলে?
কৃষিকাজের জন্য জল অপরিহার্য্য। কৃষিকাজ করার জন্য নদী, পুকুর, খাল, জলাশয় থেকে যে জল এনে কৃষি জমিতে দেওয়া হয় বা সেচন করা তাকে জলসেচ বলে।
•ভারতের কৃষিতে জলসেচ ব্যবস্থার গুরুত্ব:-
পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টি বহুল অঞ্চল মৌসিনরাম (চেরাপুঞ্জি) ভারতে অবস্থিত হলেও ভারতের কৃষিকাজে জলসেচ ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিম্নলিখিত কারণগুলোর জন্য ভারতের কৃষিকাজে জলসেচ ব্যবস্থার প্রয়োজন।
(১) মৌসুমি বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা:- ভারতের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ বৃষ্টিপাত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হলেও এই বৃষ্টিপাত অত্যন্ত অনিশ্চিত। কোনও বছরে প্রচুর মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়। আবার কোনও বছর মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ার জন্য খরা দেখা দেয়। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের এই অনিশ্চয়তার জন্য ভারতের কৃষি জমিতে জলসেচের প্রয়োজন হয়।
(২) শীতকালীন বৃষ্টিপাতের অভাব:- দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বৈশিষ্ট্য অনুসারে শীতকালে তামিলনাড়ু উপকুল এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের কোনও কোনও অংশ ছাড়া ভারতে বৃষ্টিপাত হয় না। সেই জন্য শীতকালীন রবিশস্য চাষের জন্য ভারতে জলসেচের প্রয়োজন হয়।
(৩) বৃষ্টিপাতের অসম বন্টন:- ভারতের সর্বত্র মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সমান নয়, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও দাক্ষিণাত্য মালভূমির মধ্যভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম হওয়ায় এই সব অঞ্চলে কৃষি কাজের জন্য জলসেচের প্রয়োজন হয়।
(৪) উচ্চ ফলনশীল শস্যের চাষ:- বর্তমানে ভারতে প্রচলিত নানারকম উচ্চ ফলনশীল শস্যের চাষে হয়। উচ্চ ফলনশীল শস্যের চাষে প্রচুর জলের প্রয়োজন হওয়ায় ব্যাপক ভাবে জলসেচের প্রয়োজন হয়।
(৫) মৃত্তিকার অসম ধারণ ক্ষমতা:- ভারতের সব অঞ্চলে মৃত্তিকার জল ধারণ ক্ষমতা সমান নয়। যেসব অঞ্চলের মৃত্তিকার জল ধারণ ক্ষমতা কম, সেখানকার কৃষি কাজের জন্য জলসেচের প্রয়োজন হয়।
(৬) বহু ফসলী চাষ:- আজকাল বৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতিতে একই জমিতে বহু বার ফসল ফলানো যায়। একই জমিতে বছরে বহুবার ফসল ফলানোর জন্য কৃষি জমিতে সারা বছর ধরে সেচের জলের যোগান রাখা অপরিহার্য।
(৭) ভারতে কৃষি জমির প্রয়োজন বৃদ্ধি:- কৃষিজ দ্রবের চাহিদা পূরণের জন্য কৃষি যোগ্য জমির সম্প্রসারণ প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। অসেচ সেবিত জমিতে আজকাল বৈজ্ঞানিক কৃষি পদ্ধতিতে সেচের ব্যবস্থা করে ফসল ফলানো হচ্ছে। এর জন্য এই সব কৃষি জমিতে সারা বছর ধরে সেচের জলের যোগান রাখা অপরিহার্য।
ভারতের জলসেচের বিভিন্ন পদ্ধতি:-
ভারতে সাধারণত তিনটি পদ্ধতির সাহায্যে জলসেচ করা হয়, যথা:-
(১) কুপ ও নলকূপ।
(২) পুকুর ও জলাশয় এবং,
(৩) সেচখাল।
(১) কুপ ও নলকূপ:- ভারতের যেসব অঞ্চলে ভৌম জলের প্রাচুর্য বেশি, অর্থাৎ যে সব অঞ্চলে বৃষ্টির জল পাললিক শিলাস্তর ভেদ করে মাটির নিচে জমা হতে পারে, সাধারণত সেইসব অঞ্চলে কুপ ও নলকুপের সাহায্যে জলসেচ করা হয়ে থাকে। উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, অসম, পশ্চিমবঙ্গ প্রভৃতি রাজ্যে কুপ ও নলকূপের সাহায্যে জলসেচ করা হয়ে থাকে।
(২) পুকুর ও জলাশয়:- বর্ষাকালে বৃষ্টির জল প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম জলাধার অথবা পুকুরে সঞ্চয় করে রেখে সেচের কাজে লাগানো হয়। পাথুরে ভূমি এবং কঠিন ও অপ্রবেশ্য শিলায় গঠিত দাক্ষিণাত্য মালভূমির অপ্রবেশ্য শিলাস্তর ভেদ করে বৃষ্টির জল মাটির নিচে সঞ্চিত হতে পারে না, তাই দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পুকুর বা জলাশয় তৈরি করে তা থেকে সেচ করা হয়।
(৩) সেচ খাল:- প্রধানত নদনদী বহুল অঞ্চলে সেচখালের সাহায্যে জলসেচ করা হয়।
সাধারণত সেচখাল গুলো দু-রকমের হয়, যেমন—
(ক) নিত্যবহ খাল।
(খ) প্লাবন খাল।
(ক) নিত্যবহ খাল :- সারাবছর জল থাকে এমন নদী থেকে কাটা খালকে নিত্যবহ খাল বলে। নদিতে বাঁধ দিয়ে জল উঁচু করে রাখবার ফলে নিত্যবহ খালে সারা বছর জল থাকে। আর এই জল সেচের কাজে লাগানো হয়। পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রধানত নিত্যবহ খালের সাহায্যে জলসেচ করা হয়।
(খ) প্লাবন খাল :- প্লাবন খাল সাধারণত বর্ষার প্লাবনে জলপূর্ণ হয়। তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে অনেক প্লাবন খাল দেখা যায়।
•বহুমুখী নদী পরিকল্পনা:-
নদী বহুল ভারতবর্ষের নদীগুলোর মোট জল প্রবাহের কেবলমাত্র ৬ শতাংশ জলসেচের জন্য এবং ১.৫ শতাংশ জল বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়, বাকি অংশ অব্যবহৃত থাকে। এছাড়া ভারতের নদীগুলো বিশেষ করে বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা লাভের পর সরকার এই জল সম্পদকে কাজে লাগানোর জন্য বহুমুখী নদী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এই পরিকল্পনা গুলোর নদী গুলোর ওপর বাঁধ দিয়ে জলাশয় বা কৃত্রিম হ্রদ সৃষ্টি করা হয়।
•বহুমুখী নদী পরিকল্পনা কাকে বলে?
যে পরিকল্পনার সাহায্যে নদীগুলোর উপর বাঁধ দিয়ে একই সঙ্গে বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধন, বিশেষ করে নদীর অববাহিকা অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবন যাত্রার মানের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য নদী প্রবাহকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়, তাকে ‘বহুমুখী নদী পরিকল্পনা’ বলা হয়।
যেমন :-দামোদর নদী পরিকল্পনা,ভাকরা নাঙ্গাল নদী পরিকল্পনা।
•বহুমুখী নদী পরিকল্পনা কাকে বলে?
যে পরিকল্পনার সাহায্যে নদীগুলোর উপর বাঁধ দিয়ে একই সঙ্গে বিভিন্ন উদ্দেশ্য সাধন, বিশেষ করে নদীর অববাহিকা অঞ্চলের অধিবাসীদের জীবন যাত্রার মানের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির জন্য নদী প্রবাহকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়, তাকে ‘বহুমুখী নদী পরিকল্পনা’ বলা হয়।
যেমন :-দামোদর নদী পরিকল্পনা,ভাকরা নাঙ্গাল নদী পরিকল্পনা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "ভারতের জলসেচ ব্যবস্থা:(Irrigation system of India)."