ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ:(Natural plant of India).

➡️স্বাভাবিক উদ্ভিদ কাকে বলে?

যে সমস্ত গাছ বা উদ্ভিদ কোনও স্থানের জলবায়ু ও মৃত্তিকা সহ স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই জন্মায় ও বড়ো হয়, তাদের ওই স্থানের স্বাভাবিক উদ্ভিদ বলা হয়। 



দেশের জলবায়ুর সঙ্গে স্বাভাবিক উদ্ভিদের সম্পর্ক খুব নিবিড়। জলবায়ু ছাড়া ভূমির প্রকৃতি ও মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন রকমের স্বাভাবিক উদ্ভিদ জন্মায়। ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু ও মৃত্তিকার বিভেদের উপর নির্ভর করে ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদকে ছয়ভাগে ভাগ করা যায়; যথা:-
(১) হিমালয়ের বনভূমি।
(২) চিরহরিৎ বৃক্ষের বনভূমি।
(৩) পর্ণমোচী বৃক্ষের বনভূমি।
(৪) গুল্ম ও তৃণ অঞ্চল।
(৫) মরু অঞ্চলের উদ্ভিদ।
(৬) ম্যানগ্রোভ বনভূমি।


👉হিমালয়ের বনভূমি:-
হিমালয়ের বিভিন্ন উচ্চতায় বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের বনভূমি দেখতে পাওয়া যায়।
(ক) পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের পাদদেশ থেকে ১০০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত শিশু, চাপলাস, মেহগনি, গর্জন,রোজউড প্রভৃতি শক্ত কাঠের চিরহরিৎ বনভূমি দেখা যায়। পশ্চিম হিমালয়ে এই বনভূমি দেখা যায় না।

(খ) পূর্ব হিমালয়ের ১০০০ মিটার থেকে ২৫০০ মিটার উচ্চতায় ও পশ্চিম হিমালয়ের ৫০০ মিটার থেকে ২০০০ মিটার উচ্চতায় পপলার, ওক, ম্যাপল, ওয়ালনাট, বার্চ প্রভৃতি পর্ণমোচী বৃক্ষের অরণ্য দেখা যায়।

(গ) পূর্ব হিমালয়ের ৩০০০ মিটার থেকে ৪০০০ মিটার উচ্চতায় এবং পশ্চিম হিমালয়ের ২০০০ মিটার থেকে ৩০০০ মিটার উচ্চতায় পাইন, দেবদারু, ফার, স্প্রুস, এলম প্রভৃতি নরম কাঠের সরলবর্গীয় বৃক্ষের অরণ্য দেখা যায়।

(ঘ) আরো ওপরের দিকে জুনিপার, রডোডেনড্রন, ন্যাক্সভমিকা প্রভৃতি আল্পীয় তৃণভূমি দেখা যায় । শক্ত কাঠ আসবাবপত্র ও গৃহনির্মাণ এবং নরম কাঠ দেশলাই প্রস্তুত ও জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হয়।



👉চিরহরিৎ বৃক্ষের বনভূমি:-
ভারতের যে সমস্ত অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ২০০ সেন্টিমিটারের বেশি, সেখানে চিরহরিৎ বৃক্ষের বনভুমি দেখা যায়। অত্যাধিক বৃষ্টিপাতের জন্য এখানকার গাছপালা সারাবছরই সবুজ পাতায় ভরা থাকে। চিরহরিৎ শব্দের অর্থ হল চির সবুজ।  শিশু, গর্জন, রোজউড, মেহগিনি, চাপলাস, বোগানোমা, নাহার, লোহাকাঠ ইত্যাদি প্রধান বৃক্ষ ছাড়া মাঝে মাঝে রবার, বাঁশ ও আবলুস বৃক্ষও দেখা যায়। এসব কাঠ খুবই শক্ত ও ভারি। এগুলি গৃহনির্মাণ ও আসবাবপত্রের জন্য ব্যবহৃত হয়। পশ্চিম ঘাট ও পূর্ব ঘাট পর্বতমালা, পূর্বাঞ্চল, অরুণাচল, অসম, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশার বৃষ্টিবহুল অংশে এই বনভুমি দেখা যায়। পশ্চিমঘাট পর্বতাঞ্চল বা হিমালয় পর্বতাঞ্চল হল ভারতের একটি চিরহরিৎ অরণ্য অঞ্চল।


👉পর্ণমোচী বৃক্ষের বনভূমি:-
ভারতের যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১০০ সেন্টিমিটার থেকে ২০০ সেন্টিমিটার, সেখানে পর্ণমোচী বৃক্ষের অরণ্য দেখা যায়। এই সব বৃক্ষ তার পাতাগুলি নির্দিষ্ট সময়ে মোচন করে অর্থাৎ পাতাগুলি ঝরে যায় আবার নতুন পাতা জন্মায়। শাল, সিমুল, সেগুন, জারুল, মহুয়া, পলাশ, শিরিস, বট, অশ্বত্থ, কুসুম, আম, কাঁঠাল প্রভৃতি পর্ণমোচী বৃক্ষের উদাহরণ। এদের মধ্যে কোনও কোনও গাছের ফল খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, পশ্চিমঘাট পর্বতমালা প্রভৃতি অঞ্চলে পর্ণমোচী বৃক্ষের বনভুমি দেখা যায়।



👉গুল্ম ও তৃণ অঞ্চল:-
ভারতের যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৫০ সেন্টিমিটার থেকে ১০০ সেন্টিমিটার, সেখানে বড় গাছ না জন্মে তৃণ বা গুল্মের জন্ম হয়। ভারতে সাবাই, কাশ, মঞ্জু ইত্যাদি জাতীয় ঘাস কাগজ প্রস্তুত করতে প্রযোজন হয় এবং অন্যান্য ঘাস ঘর ছাওয়ার কাজে লাগে। আরাবল্লীর পূর্বাংশ, গুজরাট, পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলে এই বনভুমি দেখা যায়।



👉মরু অঞ্চলের উদ্ভিদ:- 
ভারতের যেখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৫০ সেন্টিমিটারের কম এবং উত্তাপ খুব বেশি, সেখানে জলের অভাবে ক্যাকটাস বা কাঁটাজাতীয় গাছ জন্মায়। বাবলা, ফনিমনসা, তেশিরা প্রভৃতি হল ভারতের উল্লেখযোগ্য কাঁটা জাতীয় গাছ। অপেক্ষাকৃত আর্দ্র অঞ্চলে বুনো খেজুর, তাল, বেবি প্রভৃতি উদ্ভিদ দেখা যায়।


👉ম্যানগ্রোভ বনভুমি:-
নদীর বদ্বীপ অঞ্চল ও অন্যান্য নিচুস্থান, যেখানে সমুদ্রের লোনা জল প্রবেশ করে, সেইসব অঞ্চলে যে বনভুমির সৃষ্টি হয় তাকে ম্যানগ্রোভ বনভুমি বলে। ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল— এই সব গাছের শিকড় নদীর জোয়ারের সময় শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়ার জন্য মাটি ফুঁড়ে উপরে ওঠে, একে শ্বাসমূল বলে। এছাড়া কান্ডকে সোজাভাবে ধরে রাখার জন্য এইসব গাছে ঠেসমূলও দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গ দক্ষিণে অবস্থিত সুন্দরবন হল ভারতের একটি উল্লেখযোগ্য ম্যানগ্রোভ অরণ্যের উদাহরণ। এছাড়া ভারতের গঙ্গা, মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা প্রভৃতি নদীর বদ্বীপ অঞ্চল, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নিম্নউপকূল ভাগ, কাম্বে উপসাগরের নিম্ন জলাভূমিতে ম্যানগ্রোভ অরণ্য দেখা যায়। ম্যানগ্রোভ অরণ্যের গাছগুলোর মধ্যে সুন্দরী, গরান, গেঁও, ক্যাওড়া, হোগলা, গোলপাতাপ্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। এই বনের কাঠ সাধারণত নৌকো ও গৃহনির্মাণের প্রধান কাঁচামাল অথবা জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া এই বনভূমিতে মধু ও মোম পাওয়া যায়।




➡️ভারতে বনভূমি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা:-
জনজীবনে বনভূমির প্রভাব অপরিসীম। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নান রকম উপকার বনভূমি থেকে পাওয়া যায়— যেমন:
(১) আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য:- বনভূমি আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। দিনের বেলা গাছেরা নিজেদের সালোকসংশ্লেষের প্রয়োজনে প্রাণীজগতের পক্ষে দূষিত বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড শোষন করে এবং প্রাণীজগতের অশেষ কল্যান সাধন করে। বনভূমি পরিবেশকে দুষণ মুক্ত রাখতে সাহায্য করে। শহরাঞ্চলে প্রধানত এই কারণেই বৃক্ষ রোপন করা হয়।

(২) ভূমিক্ষয় রোধ:- বনভূমি ভূমিক্ষয় প্রতিরোধ করে। গাছেরা নিজেদের শিকড়ের সাহায্যে মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে বৃদ্ধি পায়। এতে ভূমিক্ষয় নিরারণ হয়।

(৩) মরুভূমির প্রসার রোধ:- বনভূমি মরুভূমির প্রসার রোধে সাহায্য করে। বনভূমির উপস্থিতির ফলে ভূমিক্ষয় বন্ধ হয়ে মরুভূমির প্রসার রোধ করে।

(৪) মৃত্তিকার উর্বরতা বৃদ্ধি:- বনভূমি মৃত্তিকার উর্বরতা বৃদ্ধি করে। বনভূমির গাছেদের পাতা, ফুল, মূল, কান্ড প্রভৃতি পচে মৃত্তিকার উর্বরতা বাড়ায়।

(৫) বৃষ্টিপাত:- বনভূমি বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে। গাছের প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার ফলে বাষ্পীভবনের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বনভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে।

(৬) অর্থকরী দিক:- বনভূমি মানুষের অর্থকরী দিক থেকেও লাভজনক। বনভূমি থেকে আহরণ করা ফলমূল, মধু, কাঠ এবং বিভিন্ন ধরনের বনজ সম্পদ মানুষকে জীবিকা নির্বাহ করতে সাহায্য করে।

(৭) জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষা:- বনভূমি জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষা করে। বিভিন্ন জীবজন্তুর আশ্রয় স্থল ও বাসভূমি হওয়ায় বনভূমি জীবজগতের ভারসাম্য রক্ষা করে।
এই সব কারণের জন্য ভারতবাসীদের নিজেদের স্বার্থেই ভারতে বনভূমি সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন।




➡️সামাজিক বন সৃজন:-
সমাজের মঙ্গলের জন্য, অর্থাৎ পরিবেশের সুস্থতা, জীব জগতের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জনসাধারণের চাহিদা পূরনের জন্য জনগণের সহায়তায় বন সৃজন করা হলে, তাকে সামাজিক বন সৃজন বলে।
সামাজিক বন সৃজন তথা বৃক্ষরোপণে ভারতের সাধারন মানুষকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। কারণ — বনভূমির বৃদ্ধির ফলে পরিবেশের সুস্থতা, জীবজগতের কল্যাণমূলক উদ্দেশ্য সাধিত হয়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, কৃষিজমির পরিমাণ বৃদ্ধি, শিল্পের প্রসার, অবৈজ্ঞানিক বৃক্ষচ্ছেদন, ব্যাপক পশুচারণ, ঝুমচাষ প্রভৃতির ফলে বনভুমির পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, ফলে পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ছে। এই কারণে সরকার দূষণমুক্ত, নির্মল পরিবেশ বৃদ্ধির জন্য বৃক্ষরোপণের ওপর জোর দিয়েছেন। বর্তমানে সরকার বিভিন্ন পৌরসভা ও পঞ্চায়েতগুলির মাধ্যমে বৃক্ষরোপণের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এই উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বন মহোৎসব কর্মসূচি, ‘একটি শিশু—একটি গাছ’ প্রকল্প প্রভৃতি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারন মানুষকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।



•ভারতের সামাজিক বন সৃজনের ঘোষিত কর্মসূচীগুলো হল —
(১) পতিত ও অব্যবহৃত জমিতে গাছ লাগানো,
(২) গ্রামবাসীদের রান্না ও অন্যান্য প্রয়োজনে ব্যবহার্য কাঠ সরবরাহকারী বৃক্ষরোপণ,
(৩) জাতীয় সড়ক ও রাজ্য সড়কের দু-পাশে ছায়াপ্রদায়ী বৃক্ষরোপণ,
(৪) রেললাইন, খাল, হ্রদ ও পুকুরের ধারে ধারে বৃক্ষরোপণ এবং
(৫) জনসাধারণের দৃষ্টি নন্দন বৃক্ষরোপণ।

➡️ভারতের অরণ্য গবেষণাগার:-
ভারতের অরণ্য গবেষণাগারটি উত্তরপ্রদেশের দেরাদুনে অবস্থিত। বনভুমির উন্নতি ও বনজ সম্পদের সঠিক ব্যবহারের জন্য এখানে নানান ধরনের গবেষণা করা হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "ভারতের স্বাভাবিক উদ্ভিদ:(Natural plant of India)."