স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ:(Local airflow).
➡️স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ কাকে বলে?
কোনো কোনো উষ্ণ মরুভূমি, উঁচু পাহাড় প্রভৃতি অঞ্চলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিতভাবে একরকম বায়ু প্রবাহিত হতে দেখা যায়- এই বায়ুপ্রবাহকে স্থানীয় বায়ু বলা হয়।স্থানীয় কারণ বসত তাপ ও চাপের তারতম্যের জন্য বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এই বায়ু প্রবাহিত হয়। আঁধি, লু, কালবৈশাখী, চিনুক, ফন, খামসিন, সোলানো, সিরিক্কো, হারমাট্টান, মিস্ট্রাল, বোরা, টাকু, পম্পেরো, বার্গ প্রভৃতি স্থানীয় বায়ুপ্রবাহের উদাহরণ।
👉আঁধি:- উত্তর-পশ্চিম ভারতের দিল্লি, পাঞ্জাব, রাজস্থান ও উত্তরপ্রদেশের কিছু অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের বিকেলবেলার দিকে কখনও কখনও এক রকমের ধুলোর ঝড় প্রবাহিত হতে থাকে, একে আঁধি বলে। আঁধির সময় বাতাস পরিচলন পদ্ধতিতে প্রচুর পরিমাণে ধূলিকণা সংগ্রহ করে প্রতি ঘন্টায় ৭০ - ১০০ কি.মি. বেগে প্রবাহিত হতে থাকে। আঁধি প্রবাহিত হলে বায়ুর তাপমত্রা কমে যায়।
👉লু :- গ্রীষ্মকালে বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে ভারতের উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, বিহার প্রভৃতি অঞ্চলে মাথার ওপর লম্বভাবে প্রচন্ড সূর্যকিরণের ফলে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হওয়ার জন্য শোঁ-শোঁ শব্দ করে যে উত্তপ্ত বায়ু প্রচন্ড বেগে প্রবাহিত হয়, তাকে লু বলে। লু একটি স্থানীয় বায়ু। এই বায়ু খুব উষ্ণ, শুষ্ক ও পীড়াদায়ক। লু-এর প্রভাবে বায়ুর তাপমাত্রা বাড়ে, কিন্তু আঁধি এসে বায়ুর তাপমাত্রা কমিয়ে কিছুটা স্বস্তি দেয়।
👉কালবৈশাখী:- বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গও পূর্ব ভারতের উপকূলবর্তী অঞ্চলে চৈত্র-বৈশাখ মাসে সূর্যের তাপে স্থানীয়ভাবে কিছু নিম্নচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। সেই সময় বিকেলের দিকে মাঝে মাঝে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে বজ্র-বিদ্যুৎ ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এক ভীষণ ঝড় প্রবলবেগে ছুটে আসে। এর নাম কালবৈশাখী। এর প্রভাবে মাঝে মাঝে কিছু কিছু বৃষ্টিপাত হয়। কালবৈশাখীর প্রভাবে দিনের দুঃসহ গরম কমে যায়।
১) কালবৈশাখী একটি আকস্মিক বায়ুপ্রবাহ।
২) গ্রীষ্মকালের শুরুতে এপ্রিল-মে মাসে ছোটনাগপুর মালভূমি ও পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল প্রখর সূর্যতাপে দ্রুত উত্তপ্ত হয়, ফলে সেখানে স্থানীয়ভাবে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হলে, সেই নিম্নচাপ কেন্দ্রের দিকে প্রচন্ড বেগে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এবং উত্তরের শীতল বায়ু ছুটে আসে। এই দুই বিপরীতধর্মী বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষের ফলে যে ঘূর্ণবাতের সৃষ্টি হয়, তাকেই কালবৈশাখী বলে।
৩) কালবৈশাখীর ঘূর্ণবাত সাধারণত উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ছুটে আসে, তাই একে ইংরেজিতে Nor’ Wester (নর-ওয়েস্টার) বলা হয়।
৪) কালবৈশাখীর বায়ু বেশ ঠান্ডা, তাই এই বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে গ্রীষ্মের প্রচন্ড উষ্ণতা একলাফে অনেকটা কমে যায়।
👉চিনুক:- উত্তর আমেরিকায় রকি পার্বত্য অঞ্চল থেকে প্রেইরি অঞ্চলের দিকে এক রকমের উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু পর্বতের গা বেয়ে প্রবাহিত হয় ও নীচের দিকে নেমে আসে একে চিনুক বলা হয়।
চিনুকের প্রভাবে প্রেইরি অঞ্চলের উষ্ণতা প্রায় ১৫০ - ২০০ সেলসিয়াস বেড়ে যায় এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জমা বরফ গলে যায়। এই জন্য এই বায়ুপ্রবাহকে রেড ইন্ডিয়ানরা স্নো ইটার বা তুষার ভক্ষক বলে।
👉ফন:- শীতকালে ইউরোপের আল্পস পার্বত্য অঞ্চল থেকে জার্মানির রাইন নদীর উপত্যকার দিকে এক রকমের আর্দ্র ও উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হয় একে ফন বলা হয়। ফনের প্রভাবে রাইন উপত্যকা ও আল্পস পর্বতের উত্তর ঢালের বরফ গলে যায় এবং বৃষ্টিপাত হয়।
👉খামসিন:- সাহারা মরুভূমি অঞ্চল থেকে একরকম উষ্ণ, শুষ্ক, ধূলাপূর্ণ ও কষ্টদায়ক বায়ু প্রবাহিত হয়। স্থানভেদে এই বায়ুপ্রবাহ বিভিন্ন নামে পরিচিত। মিশরে এর নাম খামসিন।
👉সোলানো:- সাহারা মরুভূমি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন উষ্ণ, শুষ্ক ও ধুলোপূর্ণ বায়ু স্পেনে সোলানো নামে পরিচিত।
👉সিরক্কো:- গ্রীষ্মকালে আফ্রিকার লিবিয়া মরুভূমি থেকে এক ধরনের অতি উষ্ণ, শুষ্ক ও ধুলোপূর্ণ বায়ুপ্রবাহ উৎপন্ন হয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে, এই বায়ুপ্রবাহকে সিরক্কো বলে। ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করার সময় এই বায়ু জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে আর্দ্র ও উষ্ণ বায়ুতে পরিণ হয় এবং সিসিলি দ্বীপ, দক্ষিণ ইটালি প্রভৃতি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।
👉হারমাট্টান:- উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় অবস্থিত সাহারা মরুভূমির পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে গিনি উপকূলের দিকে এক রকমের উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়, একে হারমাট্টান বলে। এই বায়ুপ্রবাহের ফলে আদ্র ও স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া যুক্ত গিনি উপকূলের আবহাওয়া শুষ্ক ও আরাম দায়ক হয়।
👉মিস্ট্রাল:- শীতকালে ইউরোপের আল্পস পর্বত থেকে দক্ষিণ ফ্রান্সের রোন উপত্যকার দিকে একরকমের শীতল ও শুষ্কবায়ু প্রবল গতিতে প্রবাহিত হয়, এই বায়ুপ্রবাহকে মিস্ট্রাল বলে। এই বায়ুর প্রভাবে রোন উপত্যকার তাপমাত্রা যথেষ্ট কমে যায়।
👉বোরা :- শীতকালে ইউরোপের আল্পস পর্বত থেকে দক্ষিণ ইটালির আড্রিয়াটিক সাগরের উপকুলের দিকে এক রকমের শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহিত হয়, এই বায়ুপ্রবাহকে বোরা বলে। এই বায়ুর প্রভাবে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা কমে যায়।
👉টাকু :- শীতকালে সুমেরু অঞ্চল থেকে উত্তর আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত আলাস্কা উপদ্বীপের ওপর দিয়ে এক রকমের অতি শীতল বায়ু প্রবাহিত হয়, এই বায়ুপ্রবাহকে টাকু বলে। এই বায়ুপ্রবাহের ফলে আলাস্কা উপদ্বীপের অনেকাংশ তুষারাবৃত হয়ে পড়ে।
👉পম্পেরো :- বসন্তকালে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের আন্দিজ পর্বতের পাদদেশ থেকে আর্জেন্টিনার পম্পাসতৃণভূমি অঞ্চলের দিকে যে উষ্ণ বায়ু প্রবাহিত হয়, তা পম্পেরো নামে পরিচিত। এই বায়ুপ্রবাহের ফলে পম্পাস অঞ্চলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়।
👉বার্গ :- দক্ষিণ আফ্রিকার কালহারি মরুভূমি থেকে এক রকমের উষ্ণ বায়ু নিকটবর্তী দেশগুলিতে প্রবাহিত হয়, এই বায়ুপ্রবাহকে বার্গ বলে। এই বায়ুপ্রবাহের ফলে কালাহারি মরুভূমির পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের উষ্ণতা বেড়ে যায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ:(Local airflow)."