নিবর্তনমূলক আটক আইন (Preventive Detention).
ভারতীয় সংবিধানে ব্যক্তিকে যথেচ্ছভাবে গ্রেপ্তার ও আটকের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইন বা সরকারের আইনানুগ নির্দেশ অমান্য করলে রাষ্ট্র আইন অমান্যকারীকে গ্রেপ্তার বা আটক করতে পারে। কিন্তু খেয়ালখুশি মতো অবৈধভাবে এই ক্ষমতা ব্যবহৃত হলে স্বৈরাচারের সৃষ্টি হয় এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই কারণে সংবিধানের ২২ নং ধারায় স্বৈরাচারী উপায়ে অবৈধ গ্রেপ্তার ও আটককে নিষিদ্ধ ঘােষণা করা হয়েছে এবং উক্ত ধারায় এই অবৈধ গ্রেপ্তার ও আটকের বিরুদ্ধে কিছু সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে হয়েছে।
সাধারণভাবে সকল আটক ব্যক্তিই উক্ত সংরক্ষিত ব্যবস্থাগুলি ভােগ করে থাকে। নাগরিক ও বিদেশী নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে এই অধিকার সমভাবে প্রযুক্ত হবে। কিন্তু নিবর্তনমূলক আটক( Preventive Detention) আইনে আটক ব্যক্তির ক্ষেত্রে উক্ত অধিকারগুলি প্রযােজ্য হবে না। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে না।
ভারতীয় সংবিধানে সাধারণ আইনে আটক ও গ্রেপ্তারের সঙ্গে নিবর্তনমূলক আটক আইনে গ্রেপ্তারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আইন অমান্য বা অপরাধ করার জন্য কোনাে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা আটক করলে তাকে শাস্তিমূলক আটক( Punitive Detention) বলে। কিন্তু আইন অমান্য করতে পারে এই আশঙ্কার ভিত্তিতে কোনাে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলে সেই গ্রেপ্তার বা আটককে নিবর্তনমূলক আটক বা গ্রেপ্তার বলা হয়। তাই নিবর্তনমূলক আটক আইন হল একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। ভবিষ্যতে অপরাধ করতে পারে এই সন্দেহের বশেই কোনাে ব্যক্তিকে মাইনে বিনা বিচারে আটক করা যায়। কোনাে ব্যক্তিকে আইন সঙ্গতভাবে অপরাধী প্রমাণ করা যাবে না। কিন্তু অপরাধ করতে পারে এই সন্দেহের বশে গ্রেপ্তার করার উদ্দেশ্যেই নিবর্তনমূলক আইন প্রয়ােগ করা হয়। শিবলাল বনাম উত্তরপ্রদেশ সরকার মামলায় (১৯৫৩) সুপ্রীমকোর্টের সিদ্ধান্ত হল গ্রেপ্তার ও আটকের কারণ হিসাবে যে ঘটনার কথা বলা হয় আদালত তার সত্যতা বিচার করতে পারে না।
নিবর্তনমূলক আটক আইনও যথেচ্ছভাবে প্রয়ােগ করা যায় না। এক্ষেত্রেও সংবিধানের কতকগুলি নিয়মের উল্লেখ রয়েছে। যেমন:-
( i ) সংবিধানসম্মতভাবে প্রণীত আইনের সমর্থন ছাড়া কোনাে ব্যক্তিকে আটক করা যায় না।
( ii ) আটক ব্যক্তিকে যথাশীঘ্র সম্ভব গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হয়। আটক হবার পর আটকের কারণগুলি পরিবর্তন করা যায় না বা নতুন কারণ যুক্ত করা যায় না। তবে জনস্বার্থে কারণ প্রকাশ করা সঙ্গত মনে না করলে আটককারী কর্তৃপক্ষ আটকের কারণ নাও জানাতে পারে [২২(৬)নং ধারা ]।
( iii ) আটক ব্যক্তিকে যথাশীঘ্র সম্ভব মুক্তির জন্য আদালতের কাছে আবেদন করতে দিতে হবে। উল্লেখ্য যে, ৪৪তম সংবিধান সংশােধন আইনে নিবর্তনমূলক আটক আইনের কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের আগে মূল সংবিধান অনুযায়ী কোনাে ব্যক্তিকে উক্ত আইনে গ্রেপ্তার করে বিনা বিচারে তিনমাস পর্যন্ত আটক রাখা যেত। তার বেশী সময় আটক রাখতে গেলে একটি উপদেষ্টা পর্ষদের ( Advisory Board ) অনুমতির দরকার হত। কিন্তু ৪৪তম সংবিধান সংশােধনের পর নিবর্তনমূলক আটক আইনের পরিবর্তন করে বলা হয় যে, উপদেষ্টা পর্ষদের অনুমতি ছাড়া কোনাে ব্যক্তিকে দুই মাসের বেশী আটক রাখা যাবে না। এই উপদেষ্টা পর্ষদ গঠিত হবে তিনজন বিচারপতিদের নিয়ে। এদের মনােনীত করবেন সংশ্লিষ্ট রাজ্যের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। আরাে উল্লেখ্য যে, মূল সংবিধানে [২২(৭A)] ধারায় তিন মাসের বেশী বিনা বিচারে আটক রাখার ব্যাপারে পার্লামেন্টের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ছিল। কিন্তু এখন তা বাতিল করা হয়েছে। তার ফলে এক্ষেত্রে পার্লামেন্ট তথা আইনসভার স্বৈরাচারী ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা কিছুমাত্র নিরাপদ হয়েছে।

ধন্যবাদ❤
উত্তরমুছুন