হিমবাহ কাকে বলে? হিমবাহের ক্ষয়কার্য ও সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:(What is a glacier? Landforms formed by glacier erosion and storage).

➡️হিমবাহ কাকে বলে?

হিমারেখার উপরে তুষারক্ষেত্র। সেখানে যে তুষারপাত হয় তা প্রথম অবস্থায় আলগা আলগা হয়ে পড়ে থাকে। ফরাসি ভাষায় একে নেভে বলে। এই তুষারকণা ক্রমশ পরস্পরের সঙ্গে মিশে বরফের স্তরে পরিণত হয়। ক্রমশ আরও জামাট বেঁধে ও আয়তনে বড় হয়ে বরফের স্তুপের আকার ধারণ করে। তারপর উপরের চাপ ও বরফের নিজস্ব উষ্ণতায় নীচের কিছু বরফ গলে গেলে সেই বরফের স্তুপ পর্বতের ঢালে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে ধীরে ধীরে নিচে নামতে শুরু করে। এই চলমান বরফের স্তুপকে হিমবাহ বলা হয়।
প্রকৃতপক্ষে হিমবাহ এক বরফের নদী। নদীর মত হিমবাহ দুরন্ত গতিশীল নয়।দিনে হিমবাহের গতি কয়েক সেন্টিমিটার মাত্র।
উদাহরণ: যমুনা নদী যমুনোত্রী হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হয়েছে।


👉হিমবাহের কাজ:-
পৃথিবীর দুই মেরু অঞ্চলে ও উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে অত্যধিক ঠান্ডা। এইসব অঞ্চলে তুষারক্ষেত্র ও হিমবাহ দেখা যায়। অত্যধিক শীতের জন্য পর্বতের উঁচু চুড়ায় ও মেরু অঞ্চলের বায়ুমন্ডলের জলীয়বাষ্প সারা বছর তুষারে জমে থাকে।  পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের প্রধান কাজ ভূমি ক্ষয় করা [ক্ষয়সাধন] এবং ক্ষয়ীভূত শিলাচূর্ণ বহন করা [বহন]। পার্বত্য অঞ্চল থেকে নামার পরে হিমবাহের প্রধান কাজ বাহিত শিলা চূর্ণ ও নুড়ি-পাথর জমা করা অর্থাৎ অবক্ষেপন বা সঞ্চয়।    


⭐হিমরেখা: মেরুপ্রদেশ ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের তীব্র শৈত্যে, যে সীমারেখার উপরে অত্যধিক শীতলতার জন্য সারা বছর তুষার জমে থাকে এবং নীচে উত্তাপে তুষার গলে যায় তাকে সেই সীমারেখাকে হিমরেখা বলে।  হিমরেখার ওপরে থাকে চির তুষারক্ষেত্র। হিমরেখার ঊর্ধ্বে বৃষ্টিপাতের পরিবর্তে সর্বদা তুষারপাত হয়। ক্রমাগত সঞ্চয় এবং পারস্পারিক চাপের ফলে প্রাথমিক আলগা তুষার কণাগুলি কালক্রমে দৃঢ়সংবদ্ধ  হয়ে বরফে পরিণত হয়। পৃথিবীর সর্বত্র হিমরেখা একই উচ্চতায় অবস্থান করে না। অক্ষাংশ, উচ্চতা ও জলীয়বাষ্পের পরিমানের উপর হিমারেখার সীমা নির্ভর করে। মেরুপ্রদেশে হিমরেখা সমুদ্র সমতলে, নিরক্ষীয় অঞ্চলে হিমারেখা ৫৫০০ মিটার উচ্চতায়, পূর্ব হিমালয়ে হিমরেখা ৩৯৬০ মিটার, পশ্চিম হিমালয়ে ৩৮০০ মিটার, মধ্য আল্পস পর্বতে হিমরেখা ২৭০০ মিটার এবং আন্দিজ ও কিলিমাঞ্জারো পর্বতে হিমরেখা ৫৪৩০ মিটার উচ্চতায় অবস্থান করে। এইসব অঞ্চলে হিমরেখার ঊর্ধ্বে  সারা বছরই তুষার জমে থাকে।

⭐হিমানী-সম্প্রপাত: পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে পার্বত্য অঞ্চলে হিমরেখার উপরে অর্থাৎ তুষারক্ষেত্রের জমাট বাঁধা বরফ অত্যন্ত ধীরগতিতে পর্বতের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে আসতে থাকে ।  কখনো কখনো পাহাড়ের ঢালে চলমান এইরকম হিমবাহ থেকে বিশাল বরফের স্তূপ ভেঙে প্রচন্ড বেগে নীচের দিকে পড়তে দেখা যায়, একে হিমানী সম্প্রপাত বলে। বিশাল আকৃতির হিমানী সম্প্রপাতের ফলে নিকটবর্তী অঞ্চলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয় ও এই হিমানী-সম্প্রপাতের গতি পথে অবস্থিত বাড়িঘর, গাছপালা প্রভৃতি ধ্বংস হয়ে যায়।

👉হিমবাহের শ্রেণিবিভাগ: হিমবাহ প্রধানত তিন প্রকার, যথা-  
(ক) উপত্যকা হিমবাহ বা পার্বত্য হিমবাহ।
(খ) মহাদেশীয় হিমবাহ।
(গ) পাদদেশীয় হিমবাহ।

(ক) উপত্যকা হিমবাহ বা পার্বত্য হিমবাহ: উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কিংবা অতি উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে প্রচন্ড ঠান্ডার জন্য তুষার জমে সৃষ্টি যেসব হিমবাহ পর্বতের উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং যেসব হিমবাহ তাদের গতি প্রবাহকে পার্বত্য উপত্যকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে, সেইসব হিমবাহকে পার্বত্য বা উপত্যকা হিমবাহবলে।

উদাহরণ:- ১) হিমালয়ের উত্তরে কারাকোরামের সিয়াচেন হিমবাহ (দৈর্ঘ ৭২ কিমি);  বিয়াফো (৬৩ কিমি ) ও বলটারো (৫৮ কিমি), হিসপার (৫০ কিমি.) ও বাতুরা (৬০ কিমি); ২) কুমায়ুন হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ (দৈর্ঘ ৩৯ কিমি এই হিমবাহ থেকে গঙ্গানদীর উৎপত্তি হয়েছে), কেদারনাথ (১৪ কিমি.) কাঞ্চন জঙ্ঘার জেমু হিমবাহ (দৈর্ঘ ২৬ কিমি এর থেকে তিস্তা নদীর উৎপত্তি হয়েছে) প্রভৃতি হিমালয়ের উপত্যকা হিমবাহ গুলি দৈর্ঘ্যে পৃথিবীর অন্যতম।


(খ) মহাদেশীয় হিমবাহ: মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে যে হিমবাহ অবস্থান করে তাকে মহাদেশীয় হিমবাহ বলে। সুমেরু ও কুমেরু অঞ্চল জুড়ে যে বিরাট বরফের স্তর দেখা যায় তাকেই আসলে মহাদেশীয় হিমবাহ বলে। তুষারযুগে মহাদেশগুলির অনেক অঞ্চল বরফের স্তর দ্বারা আবৃত ছিল। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বর্তমানে মহাদেশীয় হিমবাহের বিস্তার হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে দুটি মেরু অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

উদাহরণ: অ্যান্টার্কটিকার ল্যাম্বার্ট হিমবাহটি পৃথিবীর দীর্ঘতম মহাদেশীয় হিমবাহ। গ্রিনল্যান্ডেও এই রকম হিমবাহ দেখা যায়।


(গ) পাদদেশীয় হিমবাহ:  হিমবাহ যখন উঁচু পর্বতের থেকে নেমে এসে পর্বতের পাদদেশে বিরাট অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে, তখন তাকে পাদদেশীয় হিমবাহ বলে।  উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলের পাদদেশে উষ্ণতা কম থাকায় সহজেই পাদদেশীয় হিমবাহ সৃষ্টি হয়।

উদাহরণ: আলাস্কার মালাসপিনা হিমবাহটি হল পৃথিবীর বৃহত্তম পাদদেশীয় হিমবাহের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ, এটি প্রায় ৪,০০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত।


➡️হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:

👉বার্গস্রুন্ড: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, বার্গস্রুন্ড হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। হিমবাহ যখন উঁচু পার্বত্য উপত্যকা বেয়ে নীচের দিকে নেমে আসতে থাকে, তখন অনেক সময় অসমতল পর্বতের খাঁজকাটা গা এবং হিমবাহের মধ্যে ফাটলের সৃষ্টি হয়, এই সমস্ত ফাটলগুলিকে বার্গস্রুন্ড বলে। বার্গস্রুন্ড কেবলমাত্র গ্রীষ্মকালেই পরিলক্ষিত হয়। বছরের অন্য সময় এইসব ফাটলগুলো পাতলা তুষার দ্বারা ঢেকে যায়, তখন এদের উপস্থিতি ওপর থেকে বোঝা যায় না। এই জন্য কখনো কখনো বার্গস্রুন্ডগুলি পর্বতারোহিদের কাছে চরম বিপদসংকুল হয়ে ওঠে।


👉ক্রেভাসেস: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, ক্রেভাসেস হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। হিমবাহ যখন উঁচু পার্বত্য উপত্যকা বেয়ে নীচের দিকে নেমে আসতে থাকে, তখন অনেক সময় অসমতল পর্বতের খাঁজকাটা গা এবং হিমবাহের মধ্যে ফাটলের সৃষ্টি হয়।  হিমবাহের গায়ে পর পর কয়েকটি ফাটল ধরলে তাকে ক্রেভাসেসবলে। হিমবাহ যদি আগাগোড়া সমান ঢাল বিশিষ্ট অঞ্চল এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তবে ক্রেভাসেস -এর সৃষ্টি হয় না। কিন্তু যখন হিমবাহ উপত্যকার ঢাল বেড়ে যায় হিমবাহের বিভিন্ন অংশের মধ্যে গতির পার্থক্য ঘটায়। ফলে হিমবাহের পৃষ্ঠে টান পড়ে, তখনই ক্রেভাসেসের সৃষ্টি হয়।


👉সার্ক বা করি: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, সার্ক বা করি হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। হিমবাহের অত্যাধিক চাপ ও ঘর্ষনের ফলে উপত্যকার উপরের অংশ খুব খাড়াই হয় এবং মধ্য অংশে অনেকটা গর্তের মতো অবনত জায়গার সৃষ্টি হয়।  হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে পুরো উপত্যকাটির আকৃতি অনেকটা হাতল ছাড়া ডেক চেয়ারের মতো দেখতে হয়। এই রকম আকৃতিবিশিষ্ট উপত্যকাকে ফরাসি ভাষায় সার্ক এবং‌ ইংরেজিতে কুম বা করি বলে। উপত্যকা হিমবাহের উৎসক্ষেত্রে ক্ষয়কাজের ফলে সার্কের সৃষ্টি হয়। পার্বত্য উপত্যকাটি যতদিন পর্যন্ত হিমবাহে চাপা থাকে ততদিন সার্ক দেখা যায় না, হিমবাহ সরে গিয়ে উপত্যকাটি বরফযুক্ত হলে তবেই সার্ক দেখা যায়।


👉এরিটি: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, এরিটি হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। হিমবাহের অত্যাধিক চাপ ও ঘর্ষনের ফলে উপত্যকার উপরের অংশ খুব খাড়াই হয় এবং মধ্য অংশে অনেকটা গর্তের মতো অবনত জায়গার সৃষ্টি হয়।  হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে পুরো উপত্যকাটির আকৃতি অনেকটা হাতল ছাড়া ডেক চেয়ারের মতো দেখতে হয়। এই রকম আকৃতিবিশিষ্ট উপত্যকাকে ফরাসি ভাষায় সার্ক এবং ইংরেজিতে কুম বা করি বলে। উপত্যকা হিমবাহের উৎসক্ষেত্রে ক্ষয়কাজের ফলে সার্কের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি দুটি সার্কের মধ্যবর্তী খাড়াই অংশকে অ্যারেৎ বা এরিটি বলে। এরিটি এর শীর্ষদেশে অনেকটা করাতের মতো খাঁজ কাটা থাকে।


👉পিরামিড চূড়া: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, পিরামিড চূড়া হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। হিমবাহের অত্যাধিক চাপ ও ঘর্ষনের ফলে উপত্যকার উপরের অংশ খুব খাড়াই হয় এবং মধ্য অংশে অনেকটা গর্তের মতো অবনত জায়গার সৃষ্টি হয়।  হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে পুরো উপত্যকাটির আকৃতি অনেকটা হাতল ছাড়া ডেক চেয়ারের মতো দেখতে হয়। এই রকম আকৃতিবিশিষ্ট উপত্যকাকে ফরাসি ভাষায় সার্ক এবং ইংরেজিতে কুম বা করি বলে। উপত্যকা হিমবাহের উৎসক্ষেত্রে ক্ষয়কাজের ফলে সার্কের সৃষ্টি হয়। যখন একটি পাহাড়ের বিভিন্ন দিক থেকে তিন- চারটি সার্ক পাশাপাশি এক সঙ্গে বিরাজ করে, তখন এদের মধ্যবর্তী খাড়া পর্বত চূড়াটিকে পিরামিডের মতো দেখায়। পিরামিডের মতো আকৃতিবিশিষ্ট এই ধরনের পর্বত চূড়াকে পিরামিড চূড়া বলে।

উদাহরণ: আল্পস পর্বতের ম্যাটারহর্ন এবং গঙ্গোত্রীর কাছে অবস্থিত হিমালয় পর্বতের নীলকন্ঠ ও শিবলিঙ্গ শৃঙ্গ দুটি পিরামিড চুড়ার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।


👉U- আকৃতির উপত্যকা [U -Shaped Valley]: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, U- আকৃতির উপত্যকা [U -Shaped Valley] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ যে উপত্যকার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় যেখানে হিমবাহের ক্রমাগত পার্শ্বক্ষয় ও নিম্নক্ষয় সমানভাবে হওয়ার ফলে পার্বত্য উপত্যকাটির আকৃতি ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের মতো হয়ে যায়, একে ‘U’ আকৃতির উপত্যকা [U -Shaped Valley] বা হিমদ্রোণী [Glacial trough] বলে। হিমবাহ কোনো নদী উপত্যকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে হিমবাহ ও নদীর একই সঙ্গে ক্ষয়কাজের ফলে বেশিরভাগ হিমদ্রোণী গড়ে ওঠে বলে বিজ্ঞানীরা অভিমত পোষণ করেন। অনেক সময় হিমদ্রোণীর মধ্য হিমবাহ গলা জল জমে হ্রদের সৃষ্টি হয়।

👉রসে মাতনে [Roche Moutonne]: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, রসে মাতনে[Roche Moutonne] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। অনেক সময় উপত্যকার মধ্যে উঁচু ঢিবির মতো কঠিন শিলাখন্ডের ওপর দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হয়। হিমবাহের ক্ষয় কার্যের ফলে হিমবাহের প্রবাহের দিকে শিলাখন্ডটি মসৃণ এবং তার বিপরীত দিকে অসমতল বা এবড়োখেবড়ো হয়ে যায়। পার্বত্য হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে শক্ত শিলাখন্ডে গঠিত একদিকে মসৃণ এবং আর এক দিকে এবড়োখেবড়ো এইরকম শিলাখন্ড বা ঢিবিকে রসে মোতনে[Roche Moutonne] বলা হয়। রসে মোতানে হল পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহের ক্ষয়কাজের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।


👉ঝুলন্ত উপত্যকা [Hanging Valley]: উপত্যকা হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, ঝুলন্ত উপত্যকা [Hanging Valley] হল তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রধান নদীর সঙ্গে যেমন ছোটো ছোটো উপনদী এসে মেশে, সেই রকম প্রধান হিমবাহের সঙ্গে ছোটো ছোটো হিমবাহও মেশে। প্রধান হিমবাহের উপত্যকা খুব বড় ও গভীর হয়। তাই ছোটো হিমবাহের উপত্যকা প্রধান হিমবাহের উপত্যকার উপর ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে। তখন একে ঝুলন্ত উপত্যকা [Hanging Valley] বলা হয়। হিমবাহ সরে গিয়ে নদীর সৃষ্টি হলে ঝুলন্ত উপত্যকার মুখে প্রায়ই জলপ্রপাত গঠিত হয়।

উদাহরণ:- ভারতের গাড়োয়াল হিমালয়ের বদ্রীনাথের কাছে নরপর্বত থেকে নীচের দিকে কুবের নামে এইরকম ঝুলন্ত উপত্যকা হিমবাহ দেখা যায়।


👉ক্র্যাগ ও টেল [Crag & Tail]: হিমবাহের ক্ষয়কাজের ফলে যে সমস্ত রকম ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, ক্র্যাগ ও টেল [Crag & Tail] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। হিমবাহের গতিপথে কঠিন শিলাস্তরের পিছনে নরম শিলাস্তর থাকলে, অনেক সময় কঠিন শিলাস্তরটি পশ্চাদবর্তী নরম শিলাস্তরটিকে হিমবাহের ক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। এর ফলে কঠিন শিলাস্তুপটি উঁচু ঢিপির মত আর পেছনের নরম শিলা সরু লেজের মত বিরাজ করে। এই রকম কঠিন শিলাকে ক্রাগ [Crag] এবং পিছনের ঢালযুক্ত নরম শিলাকে টেল [Tail] বলে। টেল অংশটি যতই ক্রাগ থেকে দূরে যায়, ততই সরু হয়ে পড়ে।

➡️হিমবাহের সঞ্চয় কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ:


👉গ্রাবরেখা [Moraine]: হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, গ্রাবরেখা [Moraine] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষয় পাওয়া শিলাখন্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের সঙ্গে বয়ে চলে। এইসব বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাখন্ড বা শিলাচূর্ণে কিছু অংশ হিমবাহের দু’পাশে, সামনে ও তলদেহে স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়। এই সব সঞ্চিত শিলাস্তূপকে গ্রাবরেখা [Moraine] বলে।


👉গ্রাবরেখার শ্রেণিবিভাগ: গ্রাবরেখার অবস্থান অনুযায়ী গ্রাবরেখা নানান ধরনের হয়, যেমন:-

১) পার্শ্ব-গ্রাবরেখা [Lateral Moraine] : হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, গ্রাবরেখা [Moraine] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষয় পাওয়া শিলাখন্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের সঙ্গে বয়ে চলে। এই সব বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাখন্ডের কিছু অংশ হিমবাহের দু’পাশে, সামনে ও তলদেশে স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত এইসব শিলাস্তূপকে গ্রাবরেখা বলে। শিলাখন্ড বা শিলাচূর্ণ, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের দু’পাশে স্তূপাকারে প্রাচীরের মতো সঞ্চিত হলে তাকে পার্শ্ব-গ্রাবরেখা [Lateral Moraine] বলে।

২) প্রান্ত-গ্রাবরেখা [Terminal Moraine]: হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, গ্রাবরেখা [Moraine] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষয় পাওয়া শিলাখন্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের সঙ্গে বয়ে চলে। এই সব বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাখন্ডের কিছু অংশ হিমবাহের দু’পাশে, সামনে ও তলদেশে স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত এইসব শিলাস্তূপকে গ্রাবরেখা বলে। শিলাখন্ড বা শিলাচূর্ণ, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের সামনে স্তূপাকারে সঞ্চিত হলে তাকে প্রান্ত-গ্রাবরেখা [Terminal Moraine] বলে।

৩) মধ্য-গ্রাবরেখা [Medival Moraine] : হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, গ্রাবরেখা [Moraine] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষয় পাওয়া শিলাখন্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের সঙ্গে বয়ে চলে। এই সব বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাখন্ডের কিছু অংশ হিমবাহের দু’পাশে, সামনে ও তলদেশে স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত এইসব শিলাস্তূপকে গ্রাবরেখা বলে। শিলাখন্ড বা শিলাচূর্ণ, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের দু’পাশে স্তূপাকারে প্রাচীরের মতো সঞ্চিত হলে তাকে পার্শ্ব-গ্রাবরেখা বলে। যখনদুটি হিমবাহ, দুদিক থেকে এসে একসঙ্গে মিলিত হলে উভয়ের পরস্পর সন্নিহিত পার্শ্ব-গ্রাবরেখা দুইটি মিশে গেলে তাকে মধ্য-গ্রাবরেখা [Medival Moraine] বলে।

৪) তলদেশ-গ্রাবরেখা [Ground Moraine] : হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, গ্রাবরেখা [Moraine] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষয় পাওয়া শিলাখন্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের সঙ্গে বয়ে চলে। এই সব বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাখন্ডের কিছু অংশ হিমবাহের দু’পাশে, সামনে ও তলদেশে স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত এইসব শিলাস্তূপকে গ্রাবরেখা বলে। শিলাখন্ড বা শিলাচূর্ণ, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের তলায় স্তূপাকারে সঞ্চিত হলে তাকে ভূমি-গ্রাবরেখা বা তলদেশ-গ্রাবরেখা [Ground Moraine] বলে।

৫) আবদ্ধ গ্রাবরেখা: হিমবাহের সঞ্চয়কাজের ফলে যে সমস্ত ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, গ্রাবরেখা [Moraine] হল তাদের মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপ। পার্বত্য অঞ্চল দিয়ে হিমবাহ প্রবাহিত হওয়ার সময় ক্ষয় পাওয়া শিলাখন্ড, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের সঙ্গে বয়ে চলে। এই সব বিচ্ছিন্ন ও ক্ষয়প্রাপ্ত শিলাখন্ডের কিছু অংশ হিমবাহের দু’পাশে, সামনে ও তলদেশে স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়। সঞ্চিত এইসব শিলাস্তূপকে গ্রাবরেখা বলে। শিলাখন্ড বা শিলাচূর্ণ, নুড়ি, কাঁকর, বালি প্রভৃতি হিমবাহের মধ্যে আটকে পড়ে স্তূপাকারে সঞ্চিত হয়ে আবদ্ধ-গ্রাবরেখার সৃষ্টি করে।

উদাহরণ: তিস্তা নদীর উচ্চ অববাহিকায় লাচুং ও লাচেন অঞ্চলে নানা ধরনের গ্রাবরেখা দেখা যায়।


👉অবক্ষেপ [Drift]: পর্বতের নিম্নাংশ ও নিম্নভূমিতে হিমবাহ প্রধানত অবক্ষেপণ করে থাকে । নদী যেমন তার বাহিত বস্তুগুলিকে যথা- নুড়ি, পাথর, কাদা, বালি, কাঁকর প্রভৃতি আকৃতি অনুসারে বিভিন্ন অংশে সঞ্চিয় করে, হিমবাহ তা করে না। হিমবাহ উপর থেকে বিভিন্ন আকৃতির শিলাচূর্ণ একই সঙ্গে নিয়ে এসে এক জায়গায় জমা করে, এগুলিকে একত্রে অবক্ষেপ [Drift] বলে।


👉আগামুক বা ইরাটিক [Erratics] : হিমবাহ উপর থেকে বিভিন্ন আকৃতির শিলাচূর্ণ একই সঙ্গে নিয়ে এসে এক জায়গায় জমা করে, এগুলিকে একত্রে অবক্ষেপ [Drift] বলে। হিমবাহ অবক্ষেপিত বৃহৎ শিলাখন্ডগুলির সঙ্গে আঞ্চলিক শিলাসমূহের আকৃতিগত ও প্রকৃতিগত কোনো সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় না, তাই ওই হিমবাহ অবক্ষেপিত বৃহৎ শিলাখন্ডগুলিকে আগামুক[Erratics] বলে। কাশ্মীরের পহেলগামের উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে এই ধরনের আগামুক [Erratics] দেখা যায়।


👉বোল্ডার ক্লে [Boulder Clay]: হিমবাহ গলে গেলে তার নীচে হিমবাহের সঙ্গে বয়ে আনা বালি ও কাদার সঙ্গে বিভিন্ন আকৃতির নুড়ি-পাথর অবক্ষেপ হিসাবে সঞ্চিত হলে তাদের একসঙ্গে বোল্ডার ক্লে বা হিমকর্দ [Boulder Clay] বলা হয়।


👉ড্রামলিন [Drumlin]: হিমবাহের সঞ্চয় কাজের ফলে যেসব ভূমিরূপের সৃষ্টি হয়, ড্রামলিন [Drumlin] হল তার মধ্যে অন্যতম একটি ভূমিরূপের নিদর্শন। হিমবাহ গলে গেলে তার নীচে হিমবাহের সঙ্গে বয়ে আনা বালি ও কাদার সঙ্গে বিভিন্ন আকৃতির নুড়ি-পাথর অবক্ষেপ হিসাবে সঞ্চিত হলে তাদের একসঙ্গে বোল্ডার ক্লে বা হিমকর্দ [Boulder Clay] বলা হয়। স্তুপিকৃত বোল্ডার ক্লে অনেক সময়ে সারিবদ্ধ টিলা বা ছোটো ছোটো স্তুপের আকারে বিরাজ করে। ভূ-পৃষ্ঠের উপর এদের দেখতে অনেকটা উলটানো নৌকা বা চামচের মতো আকৃতির হয়। এই চামচের মতো আকৃতির ভূমিরূপকে ড্রামলিন[Drumlin] বলা হয়।

একটি আদর্শ ড্রামলিন ১-২ কি.মি. দীর্ঘ ৪০০-৬০০ মিটার প্রশস্ত এবং ১৫-৩০ মিটার উঁচু হয় । ড্রামলিনের ক্ষেত্রে হিমবাহ প্রবাহের দিকে অমসৃণ এবং বিপরীত দিকটি মসৃণ হয়ে থাকে। হিমবাহ যেদিকে প্রবাহিত হয় ড্রামলিনগুলি সেদিকে সমান্তরাল ভাবে অথবা লম্বালম্বিভাবে বা কোণাকুণিভাবে অবস্থান করে। এছাড়া ড্রামলিনের ঢাল হিমবাহের উজানের দিকে খাড়া এবং ভাটির দিকে মৃদু হয়।

একক ড্রামলিন সাধরণত দেখা যায় না, সাধারণত ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রামলিন দেখা যায়। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "হিমবাহ কাকে বলে? হিমবাহের ক্ষয়কার্য ও সঞ্চয় কার্যের ফলে গঠিত ভূমিরূপ:(What is a glacier? Landforms formed by glacier erosion and storage)."