অছিব্যবস্থা এবং অছিপরিষদ: (Trusteeship System and Trusteeship Council).


১৯৪৫ সালে সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে সমবেত প্রতিনিধিবৃন্দ চিরস্থায়ী শান্তিপ্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, তখনও অনেক অঞ্চলের অধিবাসী স্বাধীনতালাভের উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। তাই সেইসব অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বনির্ভর ক’রে গড়ে তোলার জন্য তাদের কয়েকটি বৃহৎ শক্তির শাসনাধীনে রাখার কথা ঘোষণা করা হয়। বৈদেশিক নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকেও শোষিত ও অত্যাচারিত না হয়ে যাতে ওইসব অঞ্চলের মানুষ আত্মনির্ভরশীল হয়ে স্বাধীনতালাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে, সেই ব্যবস্থা করবে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ। ঘোষণায় আরও বলা হয় যে, স্বাধীনতালাভের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হলেই ওইসব অঞ্চলকে স্বাধীনতা প্রদান করে স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হবে। এই ব্যবস্থা অছি-ব্যবস্থা নামে পরিচিত।


অছিপরিষদ কি?
যে সব সংস্থা অছি-ব্যবস্থার উদ্দেশ্য বাস্তবে রূপদান করে তাকে বলে অছিপরিষদ।


অছি-অঞ্চলসমূহ :-
অছি-ব্যবস্থার শর্তাধীনে যেসব অঞ্চলকে অছি-অঞ্চল বলে ঘোষণা করা হয়, সেগুলি হল:-
[১] যেসব অঞ্চল জাতিসংঘের কর্তৃত্বাধীন ব্যবস্থার অধীনে ছিল।
[২] দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে যেসব অঞ্চল শত্রুরাষ্ট্র (অক্ষশক্তি) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
[৩] যখন কোনো অঞ্চলের শাসনভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্র স্বেচ্ছায় সেই অঞ্চলকে অছি ব্যবস্থার অধীনে স্থাপন করতে চাইবে।
যেসব অঞ্চলকে অছি ব্যবস্থার অধীনে স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলি হল — অস্ট্রেলিয়ার অধীন নিউগিনি ও নাওরু, বেলজিয়ামের অধীন রোয়ান্ডা - বুরুন্ডি, ফ্রান্সের অধীন ক্যামেরুন ও টোগোল্যান্ড, ইটালির অধীন সোমালিল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ইত্যাদি।

অছি অঞ্চলসমূহকে দু - ভাগে ভাগ করা হয়,যথা—
[i] সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
[ii] সামরিক দিক থেকে গুরুত্বহীন অঞ্চল।

সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলির সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের হাতে ন্যস্ত হয়েছিল এবং সামরিক দিক থেকে গুরুত্বহীন অঞ্চলসমূহের দায়িত্ব অর্পিত হয় সাধারণ সভার হাতে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ সভাকে অছি পরিষদের সাহায্যে কাজ করতে হয়।


অছিপরিষদ [Trusteeship Council]

অছিপরিষদের গঠন: 
অছি - ব্যবস্থার উদ্দেশ্যগুলিকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য অছিপরিষদ ( Trusteeship Council ) এর সৃষ্টি। অছিপরিষদ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অন্যতম প্রধান সংস্থা হিসেবে কার্য সম্পাদন করে। এই পরিষদ সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের যেসব সদস্যকে নিয়ে গঠিত হয়, 
তারা হল:-
[১] অছি-অঞ্চলগুলির প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ।
[২] নিরাপত্তা পরিষদের সেইসব স্থায়ী সদস্য, যারা অছি অঞ্চল শাসন করে না।
[৩] সাধারণ সভা কর্তৃক ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত সদস্যরা।
অছি পরিষদের অধীন অঞ্চলগুলির প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সংখ্যায় যতগুলি, ঠিক ততগুলি রাষ্ট্রকে সাধারণ সভা নিয়োগ করতে পারে।
বর্তমানে অছিপরিষদের সদস্যসংখ্যা ৫।


অছিপরিষদের ক্ষমতা ও কার্যাবলি:-
সাধারণ সভার অধীনে থেকে অছিপরিষদ নিম্নলিখিত কার্যাবলি সম্পাদন করে :-
[১] অছি-অঞ্চলসমূহের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ তাদের বার্ষিক কার্যবিবরণী বা রিপোর্ট পেশ করলে অছিপরিষদ তা বিচারবিবেচনা করে দেখতে পারে।
[২] অছি-অঞ্চলের অধিবাসীরা তাদের অভাব - অভিযোগ বা কোনো দাবি - সম্বলিতআবেদনপত্র অছি পরিষদে পেশ করলে পরিষদ সেই অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সেইসব আবেদনপত্র পরীক্ষা করে দেখার অধিকারী।
[৩] অছি-অঞ্চলগুলির শাসনব্যবস্থা জনহিতকর কি না, তা স্বচক্ষে পরিদর্শন করার উদ্দেশ্যে পরিষদ কোনো অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে সেই অঞ্চল পরিদর্শন করার জন্য পরিদর্শক দল প্রেরণ করতে পারে।
[৪] অছি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে যে - কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করার অধিকার অছিপরিষদের রয়েছে।
[৫] প্রতিটি অছি - অঞ্চলের অধিবাসীদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ে উন্নতি পরিমাপ করার জন্য পরিষদ প্রশ্নমালা তৈরি করে অছি - অঞ্চলসমূহের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করতে পারে। প্রতিটি অছি - অঞ্চলের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এই প্রশ্নমালার ওপর ভিত্তি করে সাধারণ সভায় তাদের বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করে।


    অছিপরিষদ হল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের একমাত্র সংস্থা, যা শতকরা একশো ভাগ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। পরিষদের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে টোগোল্যান্ড, ক্যামেরুন, সোমালিল্যান্ড, টাঙ্গানিকা, রোয়ান্ডা বুরুন্ডি, মাইক্রোনেশিয়া, নামিবিয়া ও পালাউ - এর মতো অছি - অঞ্চলগুলি একের পর এক স্বাধীনতা লাভ করেছে। বর্তমানে কোনো অছি - অঞ্চলের অস্তিত্ব নেই।
বলা বাহুল্য, কোনো অছি - অঞ্চলের অস্তিত্ব না থাকায় স্বাভাবিক কারণেই অছিপরিষদ এবং সামগ্রিকভাবে অছি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "অছিব্যবস্থা এবং অছিপরিষদ: (Trusteeship System and Trusteeship Council)."