খাদ্য শৃঙ্খল | খাদ্য শৃঙ্খলের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব: (Food chain | Characteristics and importance of the food chain).

কোন  একটি  বসতি  স্থানে  উৎপাদক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণীর খাদকের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। যখন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জীব থেকে অপর জীবে শক্তির প্রবাহ ঘটে, তখন উৎপাদক থেকে শুরু করে শেষ খাদক পর্যন্ত যে শৃঙ্খল গঠিত হয়, তাকে খাদ্য শৃঙ্খল বলে।

১৯২৭ খ্রীঃ বিজ্ঞানী চার্লস এলটন তাঁর “Animal Ecology” গ্রন্থে খাদ্য শৃঙ্খল সম্পর্কে বিস্তারিত  ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিজ্ঞানী ওডাম (১৯৬৬ খ্রীঃ) খাদ্য শৃঙ্খলের একটি বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তার মতে,
যে পদ্ধতিতে খাদ্য শক্তি উৎপাদক থেকে ক্রমপর্যায়ে খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রাণী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রবাহিত হয়, সেই শক্তি প্রবাহের ক্রমিক পর্যায়কে খাদ্য শৃঙ্খল বলে।


উদাহরণ :- ঘাস(উৎপাদক)>>ঘাসফড়িং (প্রাথমিক খাদক)>>ব্যাঙ(দ্বিতীয় শ্রেণীর খাদক)>>সাপ (তৃতীয় শ্রেণীর খাদক)>>বাজপাখি (সর্বোচ্চ খাদক)।

👉খাদ্য শৃঙ্খলের গঠন :-
খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ভিত্তিতে উৎপাদক থেকে ধাপে ধাপে বিভিন্ন জীব গোষ্ঠীর মধ্যে খাদ্যশক্তির ধারাবাহিক প্রবাহ বা খাদ্য শৃঙ্খলের গঠন নিন্মলিখিতভাবে সম্পন্ন হয়:-

  • সবুজ উদ্ভিদ বা উৎপাদকেরা সালোকসংশ্লেষের সময় সৌরশক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে তাকে উৎপাদিত খাদ্যের মধ্যে স্থৈতিক শক্তিরূপে আবদ্ধ করে। প্রাথমিক খাদকেরা উৎপাদকদের খাদ্যরূপে গ্রহণ করলে ওই শক্তির কিছু অংশ প্রাথমিক খাদকের মধ্যে প্রবেশ করে।
উদাহরণ :- শৈবাল(উৎপাদক)>>জলজকীট(প্রাথমিক খাদক)।

  • গৌণ খাদকেরা প্রাথমিক খাদকদের খাদ্যরূপে গ্রহণ করলে প্রাথমিক খাদকস্তর থেকে ওই রাসায়নিক শক্তির কিছু অংশ গৌণ খাদকের মধ্যে পৌঁছায়।
উদাহরণ :- শৈবাল(উৎপাদক)>>জলজকীট(প্রাথমিক খাদক)>>মাছ(গৌণ খাদক)।

  • গৌণ খাদকদের প্রগৌন খাদকেরা খাদ্যরূপে গ্রহণ করলে গৌণ খাদক তার থেকে ওই রাসায়নিক শক্তির কিছু অংশ প্রগৌন খাদকের দেহে স্থানান্তরিত হয়।
উদাহরণ :- শৈবাল(উৎপাদক)>>জলজকীট(প্রাথমিক খাদক)>>মাছ(গৌণ খাদক)>>মানুষ(প্রগৌন খাদক)।


  এইভাবে বাস্তুতন্ত্রে শক্তি খাদ্যের মাধ্যমে অনবরত উৎপাদক স্তর থেকে ক্রমশ বড় এবং আরও বড় প্রাণীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে কোন ছেদ নেই। এ যেন শেকলের মতো একটার সাথে আরেকটা যুক্ত হয়ে রয়েছে। এইভাবে খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ভিত্তিতে উৎপাদক স্তর থেকে বিভিন্ন খাদক একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য একে খাদ্য শৃঙ্খল বলা হয়।


👉খাদ্য শৃঙ্খলের বৈশিষ্ট্য:-
  • ভিত্তি স্তর :- সবুজ উদ্ভিদ খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তি স্তর বা প্রাথমিক স্তর গঠন করে। কারণ খাদ্য শৃঙ্খলের একমাত্র উৎপাদক হল সবুজ উদ্ভিদ।

  • সর্বোচ্চ স্তর :- খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তি স্তরের পরের পুষ্টি স্তরগুলিতে বিভিন্ন খাদক এবং সর্বোচ্চ স্তরে প্রগৌণ খাদক অবস্থান করে।

  • পুষ্টিস্তর :- খাদ্যশৃঙ্খলের সাংগঠনিক একক হল পুষ্টি স্তর। প্রায় প্রতিটি খাদ্য শৃঙ্খলে পুষ্টিস্তরের সংখ্যা ৩-৫ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

  • শক্তি প্রবাহ :- খাদ্যশৃঙ্খলে এক পুষ্টি স্তর থেকে আরেক পুষ্টি স্তরে শক্তি একমুখী ভাবে প্রবাহিত হয় এবং এই শক্তি প্রবাহের সময়  প্রতিটি পুষ্টিস্তরে  শক্তির পরিমাণ ক্রমশঃ হ্রাস পায়।

  • শক্তির অপচয় :- খাদ্যশৃঙ্খলে শক্তি এক পুষ্টিস্তর থেকে অপর পুষ্টিস্তরে ধাপে ধাপে প্রবাহিত হয়  এবং প্রত্যেক ধাপে কিছু পরিমাণ শক্তির অপচয় ঘটে।

  • জীব সংখ্যা :- খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তিস্তরে জীবের সংখ্যা সবথেকে বেশি থাকে  এবং তারপর ওপরের দিকে জীবের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে।কিন্তু তাদের আকার বৃদ্ধি পায়।

  • অবিচ্ছিন্নতা :- কোন খাদ্য শৃঙ্খল বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করে না। এরা পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্নভাবে সম্পর্কযুক্ত হয়।


বাস্তুতন্ত্রে শক্তির সঞ্চার অনুসারে খাদ্য শৃঙ্খলকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
যথা :-

➡️চারণভূমি খাদ্যশৃঙ্খল বা গ্রেজিং খাদ্যশৃঙ্খল :-
যে খাদ্য শৃঙ্খলে উৎপাদক স্তর থেকে শক্তি ধাপে ধাপে তৃণভোজী ও মাংসাশী প্রাণীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, তাকে চারণভূমি খাদ্য শৃঙ্খল বা গ্রেজিং খাদ্য শৃঙ্খল বলে।
এই চারণভূমি খাদ্য শৃঙ্খল বা গ্রেজিং খাদ্য শৃঙ্খল আবার তিন প্রকারের হয়। যথা :-

🌍শিকারজীবী খাদ্যশৃঙ্খল :-
যে খাদ্য শৃঙ্খলে খাদ্যশক্তি  তৃণভোজী প্রাণীদের প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু হয় এবং খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ভিত্তিতে বৃহত্তর মাংসাশী প্রাণীর স্তরে শেষ হয়, তাকে শিকারজীবী খাদ্যশৃঙ্খল বা প্রিডেটর খাদ্যশৃঙ্খল বলে। এই ধরনের খাদ্যশৃঙ্খল উৎপাদক স্তর থেকে শুরু হয় এবং পরবর্তী উচ্চপর্যায়ের ধাপগুলিতে জীবের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পায়, জীবের আকার ক্রমশ বৃদ্ধি পায় এবং জীবের মধ্যে পরিবাহিত শক্তির পরিমাণ কমতে থাকে।
উদাহরণ :- ঘাস>>ঘাসফড়িং>>ব্যাঙ>>সাপ>>ময়ূর।

🌍পরজীবী খাদ্যশৃঙ্খল :-
যে খাদ্যশৃঙ্খলে খাদ্য-খাদক সম্পর্ক বৃহৎ জীব থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র জীবতে শেষ হয়, তাকে পরজীবী খাদ্যশৃঙ্খল বা প্যারাসাইটিক খাথ্যশৃঙ্খল বলে।এই খাদ্য শৃঙ্খলে ক্ষুদ্র জীব বৃহৎ জীবকে এমনভাবে ভক্ষণ করে যাতে বৃহৎ জীব বা পোষক কখনো মারা না যায়।
উদাহরণ :- কুকুর>>কৃমি>>আদ্যপ্রাণী।

🌍মৃতজীবী খাদ্যশৃঙ্খল :-
যে খাদ্য শৃঙ্খলে মৃত ও গলিত জীবদেহ থেকে শুরু করে খাদ্যশক্তি ক্রমান্বয়ে মৃতজীবী ও বিয়োজকের দিকে প্রবাহিত হয়, তাকে মৃতজীবী খাদ্যশৃঙ্খল বা স্যাপ্রোফাইটিক খাদ্যশৃঙ্খল বলে।
উদাহরণ :- পচা জৈবপদার্থ>>ছত্রাক>>মৃতজীবী ব্যাকটেরিয়া।

➡️জৈবাবশেষ বা কর্কর খাদ্যশৃঙ্খল :-
যে খাদ্য শৃঙ্খলে বিয়োজক দ্বারা অর্ধবিশ্লিষ্ট জৈবাবশেষ থেকে শক্তি অনুজীবের মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিভিন্ন খাদক স্তরে সঞ্চারিত হয় বা বৃহৎ খাদক প্রাণীদের মধ্যে প্রবাহিত হয়, তাকে জৈবাবশেষ বা কর্কর খাদ্যশৃঙ্খল বা ডেট্রিটাস খাদ্যশৃঙ্খল বলে। 
এই ধরনের খাদ্য শৃঙ্খল জলভাগ ও স্থলভাগ উভয় পরিবেশে গঠিত হয়।
উদাহরণ :-
🌍স্থলভাগের---->>পচনশীল জৈব বস্তু/উদ্ভিদ দেহাবশেষ>>কেঁচো>>শ্যামা পাখি>>বাজপাখি।

🌍জলভাগের---->>পচনশীল জৈব বস্তু/ম্যানগ্রোভ পাতা>>পতঙ্গের লার্ভা>>ছোট মাছ>>বড় মাছ।

👉খাদ্য  শৃঙ্খলের  গুরুত্ব :-
বাস্তুতন্ত্র  তথা   সমগ্র জীব মন্ডলের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে খাদ্য শৃঙ্খলের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে স্বভোজী উদ্ভিদ থেকে খাদ্য ও শক্তি অন্যান্য জীবে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ভিত্তিতে উদ্ভিদ ব্যতীত অন্যান্য জীবগুলি জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য ও শক্তি পেয়ে থাকে।তাই খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট হলে বাস্তুতন্ত্রের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে।খাদ্যশৃঙ্খলে উৎপাদক থেকে ক্রমপর্যায়ে খাদকের সংখ্যা হ্রাস পায়, কিন্তু প্রয়োজনীয় খাদ্যের আয়তন বৃদ্ধি পায় বলে খাদ্য শৃঙ্খল যত সংক্ষিপ্ত হয় বাস্তুতন্ত্র  ততো সুগঠিত হয়।

১টি মন্তব্য for "খাদ্য শৃঙ্খল | খাদ্য শৃঙ্খলের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব: (Food chain | Characteristics and importance of the food chain)."

  1. Casino Games Online - Jancasino.com
    Online Casino jancasino카지노 Games · 사설 토토 사이트 The Best Online Casinos kadangpintar · Best aprcasino Casino Bonuses · herzamanindir.com/ Live Dealer Casino Games. · Live Dealer Games. · Free Spins and Withdrawals · Live Casino Games.

    উত্তরমুছুন