ছাঁটাই প্রস্তাব: (Cut Motion).

পার্লামেন্ট কিংবা রাজ্য বিধানসভার অর্থ - সংক্রান্ত কার্যপদ্ধতির, বিশেষত বাজেট (অর্থাৎ বার্ষিক আয়ব্যয় - সংক্রান্ত প্রস্তাব) পাসের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় রয়েছে। এই পর্যায়গুলির প্রথমটি হল বাজেট উত্থাপন। বাজেট উত্থাপনের পর শুরু হয় বাজেটের ওপর আলোচনা। এই পর্যায়ের দুটি অংশ রয়েছে, যথা-

  • [১] সাধারণ আলোচনা।
  • [২] অর্থবরাদ্দের দাবির ওপর আলোচনা।




প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাজ্যসভা বা বিধান পরিষদ বাজেটের ওপর কেবল আলোচনাই করতে পারে। কিন্তু ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণের কোনো ক্ষমতা এই কক্ষের নেই। তা কেবল লোকসভা বা বিধানসভার ‘একক ক্ষমতা’ বলেই বিবেচিত হয়।


ছাঁটাই প্রস্তাবের অর্থ :
বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শেষ হওয়ার পর শুরু হয় অর্থবরাদ্দের দাবির ওপর আলোচনা। সাধারণভাবে প্রতিটি মন্ত্রক, অর্থাৎ মন্ত্রীর দপ্তর পৃথক পৃথকভাবে লোকসভা বা বিধানসভায় অর্থবরাদ্দের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করে। ওই প্রস্তাবের প্রকৃতি হল অনুরোধমূলক।
কারণ, প্রতিটি মন্ত্রক লোকসভা বা বিধানসভার কাছে যে - পরিমাণ ব্যয়বরাদ্দ দাবি করে, তা মেনে নেওয়ার জন্য তাকে সংশ্লিষ্ট কক্ষের অনুরোধ করতে হয়। এইভাবে প্রস্তাব উত্থাপনের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট কক্ষের সময় বাঁচানোর জন্য অধ্যক্ষ নিজেই ওইসব প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

অর্থ বরাদ্দের দাবির ওপর আলোচনার সময় প্রতিটি মন্ত্রকের নীতি ও কাজকর্ম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা ক'রে দেখা হয়। প্রতিটি মন্ত্রকের দাবির ওপর আলোচনার জন্য সময় নির্দিষ্ট থাকে। কক্ষের বিরোধী সদস্যরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক কর্তৃক অনুসৃত নীতি অনুমোদন নাও করতে কিংবা ব্যয়সংকোচনের জন্য বিবিধ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে অথবা সুনির্দিষ্টভাবে স্থানীয় মানুষের অভাব অভিযোগ বা দুঃখদুর্দশার ব্যাপারে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। তা করতে গিয়ে সদস্যরা অর্থবরাদ্দের দাবি - সংক্রান্ত মূল প্রস্তাবের যেসব সম্পূরক প্রস্তাব উত্থাপন করেন, সেগুলিকেই ‘ছাঁটাই প্রস্তাব’ বলা হয়।



ছাঁটাই প্রস্তাবের প্রকারভেদ :
লোকসভা বা বিধানসভায় যেসব ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, সেগুলিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে, যথা— 
  • [১] নীতি অনুমোদন সংক্রান্ত ছাঁটাই প্রস্তাব।
  • [২] ব্যয় সংক্ষেপের জন্য ছাঁটাই প্রস্তাব।
  • [৩] প্রতীকী ছাঁটাই প্রস্তাব।


নীতি অনুমোদন সংক্রান্ত ছাঁটাই প্রস্তাব :
তিন ধরনের ছাঁটাই প্রস্তাবের মধ্যে কঠোরতম ছাঁটাই প্রস্তাব হল নীতি অনুমোদন সংক্রান্ত ছাঁটাই প্রস্তাব। এরূপ প্রস্তাবে বিশেষ কোনো খাতে অর্থবরাদ্দের দাবিকে ছাঁটাই করে মাত্র ১ টাকায় আনার কথা বলা হয়। এর অর্থই হল— যে নীতির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী তাঁর প্রস্তাবে ব্যয় - বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন, সেই নীতিকেই এরূপ ছাঁটাই প্রস্তাবের উত্থাপক আদৌ অনুমোদন করছেন না।


ব্যয় সংক্ষেপের জন্য ছাঁটাই প্রস্তাব:
বিশেষ কোনো খাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী যে পরিমাণ ব্যয়বরাদ্দ অনুমোদনের জন্য লোকসভা বা বিধানসভায় দাবি জানান, ব্যয়সংক্ষেপের উদ্দেশ্যে তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ হ্রাস করার জন্য উত্থাপিত প্রস্তাবকে ব্যয়সংক্ষেপের জন্য ছাঁটাই প্রস্তাব বলা হয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো মন্ত্রী ২০০ কোটি টাকা ব্যয়বরাদ্দ দাবি করলে এরূপ ছাঁটাই প্রস্তাবের উত্থাপক তার থেকে ৫ কোটি বা ১০ কোটি টাকা হ্রাস করার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন।


প্রতীকী ছাঁটাই প্রস্তাব:
বিশেষ কোনো খাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী যে পরিমাণ ব্যয়বরাদ্ধ দাবি করেন, তার থেকে মাত্র ১০০ টাকা হ্রাস করার জন্য যে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তাকে বলা হয় প্রতীকী ছাঁটাই প্রস্তাব।
এরূপ প্রস্তাব উত্থাপনের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের সাধারণ মানুষের দুঃখদুর্দশার জন্য ভারত সরকারকে দায়ী ক’রে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা। তিন ধরনের ছাঁটাই প্রস্তাবের মধ্যে প্রতীকী ছাঁটাই প্রস্তাব লোকসভা বা বিধানসভায় সর্বাপেক্ষা বেশি উত্থাপিত হয়।


ছাঁটাই প্রস্তাবের গুরুত্ব :
সরকারের তরফে উত্থাপিত ব্যয়বরাদ্দ - সংক্রান্ত মূল প্রস্তাবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত যে - কোনো ধরনের ছাঁটাই প্রস্তাব একই সঙ্গে লোকসভায় আলোচিত হয়। আলোচনা শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কক্ষ প্রথমেই ছাঁটাই প্রস্তাবগুলির নিষ্পত্তি করে। তারপর ব্যয়বরাদ্দের দাবি - সংক্রান্ত প্রস্তাবটির ওপর ভোট গ্রহণ করা হয়। বিধানসভার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। ছাঁটাই প্রস্তাবগুলির কেবল প্রতীকী গুরুত্ব ছাড়া কোনো বাস্তব গুরুত্ব নেই।
কারণ, এরূপ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না বললে চলে। বিরোধী সদস্যরাই এরূপ প্রস্তাব উত্থাপন করে থাকেন। কোনো একটি ছাঁটাই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার অর্থই হল সরকার লোকসভা বা বিধানসভার আস্থা হারিয়েছে। এমতাবস্থায় আর ক্ষমতায় থাকা সমীচীন কি না, সে বিষয়ে সরকারকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। লোকসভা বা বিধানসভার কার্যপরিচালনা - সংক্রান্ত পরামর্শদাতা কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয়বরাদ্দের দাবি বিষয়ক প্রস্তাব সম্পর্কে আলোচনা ও ভোটগ্রহণের কাজ সম্পাদন করতে হয়। তাই দেখা যায় যে, নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট ব্যয়বরাদ্দের প্রস্তাবসমূহ ও সেগুলির ওপর উত্থাপিত ছাঁটাই প্রস্তাবগুলির প্রায় অধিকাংশই এবং বিগত দিনগুলিতে অনালোচিত প্রস্তাবগুলিকে কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই ভোট গ্রহণের জন্য অধ্যক্ষ পেশ করেন। এরূপ প্রক্রিয়াকে ‘গিলোটিন’ বলে চিহ্নিত করা হয়। এইভাবে ব্যয়বরাদ্দের সরকারি দাবি - সংক্রান্ত আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "ছাঁটাই প্রস্তাব: (Cut Motion)."