অনাস্থা প্রস্তাব: (Motion of no confidence).

ভারতে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে সম্পাদিত যাবতীয় কার্যের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে পার্লামেন্টের জনপ্রতিনিধি কক্ষ, অর্থাৎ লোকসভার কাছে দায়িত্বশীল থাকতে হয়।

 অনুরূপভাবে, সম্পাদিত কার্যাবলির জন্য যে কোনো রাজ্যের সরকার বিধানসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকে। তাই যতদিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার যথাক্রমে লোকসভা ও বিধানসভার আস্থাভাজন থাকে, ততদিন সেই সরকার ক্ষমতাসীন থাকতে সক্ষম হয়। তবে এরূপ আস্থা হারালে সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভার এবং রাজ্য সরকার বিধানসভার আস্থা হারিয়েছে কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কক্ষের নিয়মানুযায়ী যে - প্রস্তাব উত্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়, তাকে অনাস্থা প্রস্তাব বলে।


লক্ষণীয় বিষয় হল — ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ কোনো বা কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা যায় না। কারণ, মন্ত্রীসভার যে - কোনো কার্যের জন্য কেবল বিশেষ কোনো বা কয়েকজন মন্ত্রীকে দায়ী করা হয় না। সেজন্য সমগ্র মন্ত্রীসভাই সংশ্লিষ্ট আইনসভার নিম্নকক্ষের কাছে যৌথভাবে দায়িত্বশীল থাকে। তাই সমগ্র মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধেই অনাস্থা প্রস্তাব তুলতে হয়।



অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের পদ্ধতি :
লোকসভা বা বিধানসভার যে - কোনো সদস্য সংশ্লিষ্ট স্তরের সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারলেও কার্যক্ষেত্রে কেবল বিরোধী পক্ষের সদস্যরাই এরূপ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। 

অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য উত্থাপনকারীকে কোনো কারণ দেখাতে হয় না। তবে এরূপ প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য উত্থাপককে সংশ্লিষ্ট দিনের অধিবেশন শুরু হওয়ার পূর্বেই সাধারণ সচিবের কাছে লিখিত নোটিশ জমা দিতে হয়। এরপর সচিব সেটিকে অধ্যক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রস্তাবটি ঠিক আছে কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অধ্যক্ষের রয়েছে। 
অধ্যক্ষ প্রস্তাবটি ঠিক আছে বলে মনে করলে সংশ্লিষ্ট কক্ষের প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হওয়ার পর তিনি প্রস্তাবককে প্রস্তাব উত্থাপনের ব্যাপারে সভার অনুমতি গ্রহণের জন্য বলতে পারেন অথবা নিজেই কক্ষের সামনে প্রস্তাবটি পড়ে শোনান৷ তারপর সদস্যদের মধ্যে যাঁরা প্রস্তাবটি উত্থাপনের পক্ষপাতী, তাঁদের আসন থেকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য তিনি অনুরোধ জানান। 
লোকসভা এবং বিধানসভার ক্ষেত্রে প্রস্তাব উত্থাপনের সপক্ষে যথাক্রমে ৫০ জন ও ৩০ জন সদস্য উঠে দাঁড়ালে প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কক্ষ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে বলে অধ্যক্ষ ঘোষণা করেন। 
পূর্বোক্ত সংখ্যক সদস্যের সম্মতি না থাকলে প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। এইভাবে লোকসভা কিংবা বিধানসভায় গৃহীত হওয়ার ১০ দিনের মধ্যেই অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর আলোচনার দিন ধার্য করতে হয়। এ ব্যাপারে সরকারের অভিমত অনুযায়ী অধ্যক্ষ আলোচনার জন্য সুনির্দিষ্ট দিন ঘোষণা করেন। সরকার অবিলম্বে অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে অধ্যক্ষ সেইমতো ব্যবস্থা গ্রহণ ক'রে থাকেন। 

কিন্তু ওই প্রস্তাবের ওপর কত সময় ধরে আলোচনা বা বিতর্ক চলবে, তা নির্ধারণ করে দেয় লোকসভা বা বিধানসভার কার্যপরিচালনা সংক্রান্ত পরামর্শদাতা কমিটি নির্ধারিত দিনে এবং নির্দিষ্ট সময়ে অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শুরু হয়। সদস্যরা বক্তব্য রাখার পর প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী তার সরকারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলির জবাব দেন। তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার পর অনাস্থা প্রস্তাবের উত্থাপক জবাবি ভাষণ দিতে পারেন। এইভাবে আলোচনা বা বিতর্ক শেষ হওয়ার পরেই অধ্যক্ষ অনাস্থা প্রস্তাব সম্পর্কে কক্ষের সিদ্ধান্ত জানার জন্য সেটিকে ‘ধ্বনি ভোটে’পেশ করেন। 

তবে দাবি জানানো হলে তিনি ‘বিভাজন’ ভোট পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। অনাস্থা প্রস্তাবটি এইভাবে গৃহীত হলে সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। পদত্যাগ করার পূর্বে প্রধানমন্ত্রী লোকসভা ভেঙে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতিকে এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার জন্য রাজ্যপালকে পরামর্শ দিতে পারেন। 
কিন্তু রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপাল সেই পরামর্শ মেনে নিতে কিংবা বিকল্প মন্ত্রীসভা গঠন সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।



অনাস্থা প্রস্তাব প্রত্যাহার:
অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনকারী সদস্য ইচ্ছা করলে সেই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। অবশ্য সেজন্য তাঁকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য লোকসভা বা বিধানসভার অনুমতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে অধ্যক্ষ প্রস্তাব উত্থাপনকারী সদস্যকে আহ্বান জানালে তিনি সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবটি প্রত্যাহার ক'রে নিতে পারেন। আবার, কক্ষের সম্মতিলাভের পর প্রস্তাবের উত্থাপক সেটি প্রত্যাহার করে নিতে চাইলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট কক্ষের অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়। কক্ষ তাঁকে এরূপ অনুমতি দিলেই কেবল তিনি তা করতে পারেন। তা ছাড়া, অন্য একটি উপায়েও অনাস্থা প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেওয়া যেতে পারে। আলোচনার জন্য প্রস্তাবটি সভায় পেশ করার পূর্বে তাতে স্বাক্ষরকারী সব সদস্যকে প্রত্যাহার সংক্রান্ত একটি নোটিশ জমা দিতে হয় এবং ওই নোটিশে তাদের প্রত্যেকেরই স্বাক্ষর থাকতে হবে। এরূপ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবটিকে কক্ষের সম্মুখে আলোচনার জন্য পেশ করা হয় না। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন বা গ্রহণ করার কোনো ক্ষমতা রাজ্যসভা কিংবা বিধান পরিষদের হাতে সংবিধান অর্পণ করেনি। কারণ, পার্লামেন্ট ও রাজ্য -বিধানমণ্ডলীর এই উচ্চকক্ষ দুটি জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় না বলে সরকারকে সম্পাদিত কার্যাবলির জন্য এদের কাছে যৌথভাবে দায়িত্বশীল থাকতে হয় না।



অনাস্থা প্রস্তাব ও নিন্দাসূচক প্রস্তাবের মধ্যে পার্থক্য: 
অনাস্থা প্রস্তাব ও নিন্দাসূচক প্রস্তাবকে অনেক সময় অভিন্ন বলে মনে করা হয়। কারণ, এই দু - ধরনের প্রস্তাব গৃহীত হলে সরকারের পদত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। অন্যভাবে বলা যায়, এই দু - ধরনের প্রস্তাবের ফলাফল অভিন্ন হয়। কিন্তু এদের মধ্যে যেসব গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে, সেগুলি হল—
[১] অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য কোনো কারণ দর্শাতে হয় না। কিন্তু নিন্দাসূচক প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য কারণ দর্শাতে হয়।
[২] বিশেষ কোনো মন্ত্রী বা কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা যায় না। সম্পাদিত কার্যাবলির জন্য মন্ত্রীসভাকে আইনসভার জনপ্রতিনিধি কক্ষের কাছে যৌথভাবে দায়িত্বশীল থাকতে হয়। তাই এরূপ প্রস্তাব সামগ্রিকভাবে কেবল মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধেই উত্থাপিত হতে পারে। কিন্তু নিন্দাসূচক প্রস্তাব কেবল মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধেই নয়, সেই সঙ্গে যে - কোনো মন্ত্রী বা কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধেও উত্থাপন করা যায়।
[৩] অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য লোকসভা বা বিধানসভার অনুমতি গ্রহণ আবশ্যিক বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু নিন্দাসূচক প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য এরূপ অনুমতি গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই।
[৪] অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য লোকসভা ও বিধানসভার একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু নিন্দাসূচক প্রস্তাব গ্রহণের জন্য তার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।
[৫] সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার পর অধ্যক্ষ প্রস্তাব উত্থাপনের ১০ দিনের মধ্যে অনাস্থা প্রস্তাব আলোচনার দিনক্ষণ নির্ধারণ করেন। কিন্তু নিন্দাসূচক প্রস্তাব আলোচনার জন্য লোকসভা বা বিধানসভার কার্যপদ্ধতিতে বিশেষ কোনো নিয়মের কথা বলা নেই। অন্যান্য প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য যেসব নিয়ম রয়েছে, এরূপ প্রস্তাব উত্থাপনের ক্ষেত্রেও সেগুলি প্রযুক্ত হয়। সাধারণভাবে ‘দিন - ছাড়া উল্লেখ্য প্রস্তাব’ হিসেবেই এই ধরনের প্রস্তাবকে আলোচনার জন্য রাখা হয়।



মূল্যায়ন:
বিগত শতকের নব্বই এর দশক থেকে ভারতে প্রভুত্বকারী দলীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে জোটবদ্ধ রাজনীতির প্রাধান্য বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। যতদিন প্রভুত্বকারী দলীয় ব্যবস্থা বর্তমান ছিল, ততদিন দুর্বল বিরোধী দলগুলির পক্ষে অনাস্থা প্রস্তাব লোকসভা বা বিধানসভায় পাস করানো কার্যত অসম্ভব ছিল। আবার, সাম্প্রতিককালে জোটবদ্ধ রাজনীতি দৃঢ়ভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে অনাস্থা প্রস্তাব লোকসভা বা বিধানসভায় উত্থাপন করা গেলেও তা পাস করানো যথেষ্ট কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর বিতর্ক চলাকালে সরকারি কাজকর্মের নানাপ্রকার ত্রুটিবিচ্যুতি কিংবা নানাবিধ দুর্নীতির কথা সংশ্লিষ্ট কক্ষে তুলে ধরে বিরোধী সদস্যরা সরকারকে যথেষ্ট বিপাকে ফেলতে পারেন। বর্তমানে প্রচার মাধ্যমগুলি অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার ফলে সরকারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলি সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশন এবং বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনাচক্রের ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অবহিত হতে পারে। আইনসভার নিম্নকক্ষে এরূপ প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাবে বাতিল হয়ে গেলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অসীম বলে মনে করা হয়। তাই কোনো সরকারই অনাস্থা প্রস্তাবকে লঘু ক’রে দেখতে সাহস পায় না। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "অনাস্থা প্রস্তাব: (Motion of no confidence)."