ভারত ও সার্ক: (India and SAARC).
১৯৮৫ সালের ৮ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক (South Asian Association for Regional Co - operation - SAARC) - এর সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সনদ স্বাক্ষরকারী দেশগুলি হল ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপ। ২০০৫ সালে আফগানিস্তান সার্কের সদস্যপদ লাভ করার ফলে বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৮ - এ দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সার্ক গঠনকারী দেশগুলির রাষ্ট্রনেতারা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানাদিক থেকে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তাই তাঁরা এই ক্ষেত্রটিকে এড়িয়ে সামাজিক, অর্থনৈতি, সাংস্কৃতিক, প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় ও আঞ্চলিক উন্নতির পথ প্রশস্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। ২০১৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সার্কের শীর্ষ সম্মেলন ১৮ বার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওইসব সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবগুলিতে দারিদ্র্য দূরীকরণ থেকে শুরু করে ‘একটি সবুজ ও সুখী দক্ষিণ এশিয়া গঠন’- এর কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু প্রায় ৩৬ বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সার্কের সাফল্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কার্যত হতাশ হতে হয়। কারণ, এশিয়া মহাদেশেরই অন্য একটি আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ান ( ASEAN – Association of South - East Asian Nations ) এর সঙ্গে সার্কের তুলনা করলে দেখা যায় যে, সাফল্যের ক্ষেত্রে আসিয়ান যতখানি এগিয়ে গেছে, সার্ক ঠিক ততখানিই পেছনে পড়ে রয়েছে। এর কারণ অন্বেষণ করতে গেলে সার্কের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ ও শক্তিশালী সদস্য ভারতের ভূমিকা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে তার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সার্কের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ভারত:
ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, সামরিক প্রভৃতি দিক থেকে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলির মধ্যে ভারত সর্বাধিক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলি অবস্থিত হওয়ার ফলে এই দেশটি বাস্তবে ওইসব দেশের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী হিসেবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। আবার, দক্ষিণ এশিয়ার স্থলভাগের ৭২ শতাংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এই অঞ্চলের জনসংখ্যার প্রায় ৭৭ শতাংশ ভারতে বসবাস করে। তা ছাড়া, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিচারে এই অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দেশ হল ভারত। স্বাভাবিকভাবে আঞ্চলিক উন্নতিসাধন ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ভারত অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্বের, বিশেষত পাকিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলি আশা করেছিল।
এই বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য দু - তিনটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।
১৯৮৫ সালে সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি জয়বর্ধনে বলেছিলেন যে, ভারত তার কাজ ও কথার মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলবে বলে তিনি মনে করেন।
অনুরূপভাবে, ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে জয়বর্ধনে ভারতকে ‘সার্কের উন্নতি ও প্রগতির কেন্দ্রবিন্দু' বলে চিহ্নিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
এমনকি, ১৯৯৮ সালের শেষদিকে ভারতে প্রেরিত ইউরোপীয় সংসদীয় প্রতিনিধি দলের নেতা ভিসেজো গিউমারা (Vicenzo Giummara) ভারতকে ‘দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের স্থায়িত্ব এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সংরক্ষণের একটি উপাদান’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন।
সার্কের প্রতিষ্ঠায় ভারতের ভূমিকা:
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করে ওই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি আঞ্চলিক সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বিগত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকেই অনুভূত হয়েছিল। কিন্তু সে বিষয়ে ভারতের নিস্পৃহ মনোভাৰ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এমনকি, সত্তরের দশকের শেষদিকে বাংলাদেশের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তার প্রচেষ্টার সাফল্য সম্পর্কে ভারত যথেষ্ট সন্দিহান ছিল। তদানীন্তন ভারত সরকারের মনে হয়েছিল যে, ভারতকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যেই ওই ধরনের ক্ষতিকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অবশ্য সেই সঙ্গে একথাও সত্য যে, তদানীন্তন ভারত সরকার মনে মনে যা - ই আশঙ্কা করুক না কেন, জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের বিরোধিতা ভারত করেনি। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সার্কের অগ্রগতিতে ভারতের ভূমিকা:
পি. ভেঙ্কটেশ্বর রাও (জুনিয়র)২০১১ সালের ১৪ ই নভেম্বর প্রকাশিত তাঁর একটি প্রবন্ধ ('Why India will have to turn its back on SAARC') -এর শুরুতেই মন্তব্য করেছেন যে, সার্কের ব্যাপারে ভারতের অবস্থান সব সময়েই 'অনিশ্চিত' থেকে গেছে। “ভারত একটি ছোটো পুকুরে ছোটো ছোটো মাছের সঙ্গে সাঁতার কাটতে পছন্দ করে না। সে নিজেকে একটি বড়ো লিগ খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে চায়। আর সেজন্যই ভারত কখনো চায় না যে, তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোক। তা ছাড়া, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ভারতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পাকিস্তান একটি ‘প্রভুত্বকারী’ শক্তিতে পরিণত হবে, তা তার কাছে আদৌ কাম্য নয়। রাও - এর মতে, ‘একটি সমৃদ্ধিশালী ও গণতান্ত্রিক প্রতিবেশিত্ব’ এবং দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ‘স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ভারতের ঘোষণা ‘নিছক বাগাড়ম্বর’ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এরূপ ঘোষণাকে ভারত যদি সত্যি সত্যিই তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে তাকে বাস্তবে রূপায়িত করা তার পক্ষে কতখানি সম্ভব হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ, ভারতের ক্ষতিসাধনকারী হিসেবে সদাসর্বদাই পাকিস্তান তার ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, সার্কের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ভারতের অগ্রণী ভূমিকা না - থাকা সত্ত্বেও এর প্রতিষ্ঠাকে পাকিস্তান ভারতের ‘চাণক্য পরিকল্পনা' বলে চিহ্নিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। কারণ, পাকিস্তানের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তারের জন্যই ভারত সার্ক গঠনের ব্যাপারে বিশেষ তৎপরতা দেখিয়েছিল।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন for "ভারত ও সার্ক: (India and SAARC)."